নাইজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রিভার্স স্টেটে পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে তেলজাতীয় পণ্য সংগ্রহের সময় বিষাক্ত ধোঁয়ায় অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতের দিকে রিভার্স স্টেটের ওক্রিকা স্থানীয় সরকার এলাকার ওকারি জেটিতে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওই সময় একটি জাহাজে রপ্তানির জন্য পেট্রোলিয়াম পণ্য তোলা হচ্ছিল। একই সময়ে স্থানীয় শতাধিক যুবক কাঠের নৌকায় করে সেখানে গিয়ে একটি পাইপলাইনের অবৈধভাবে সংযুক্ত ট্যাপিং পয়েন্ট থেকে তেলজাতীয় পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, ওই অভিযানে ২০০ জনের বেশি যুবক অংশ নিয়েছিলেন। তারা অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে পাইপলাইন থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য নিজেদের নৌকায় তুলছিলেন।
এ সময় পাইপলাইনের ভেতর দিয়ে উচ্চচাপে পণ্য প্রবাহিত হওয়ায় প্রচণ্ড মাত্রায় বিষাক্ত ও ঝাঁঝালো বাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে থাকা অনেকেই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারান। কয়েকজন নদীতে পড়ে গিয়ে ডুবে মারা যান বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
যারা ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন, তাদের কয়েকজনের গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয় এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র প্রথমদিকে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। পরে একাধিক প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ৪৩ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে রিভার্স স্টেট পুলিশের মুখপাত্র এএসপি ব্লেসিং আগাবে জানিয়েছেন, ঘটনার প্রকৃত ভয়াবহতা ও হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন Youth and Environmental Advocacy Centre (YEAC-Nigeria)-ও একাধিক মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ফাইনফেস ডুমনামেনে ফাইনফেস জানান, পাইপলাইনের অবৈধ ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরানোর সময় উচ্চচাপের প্রবাহ থেকে ছড়িয়ে পড়া বাষ্পে মানুষ আক্রান্ত হন। নদীতে কয়েকটি মরদেহ ভাসতে দেখা গেছে এবং আরও অনেকে নিখোঁজ থাকতে পারেন বলেও তিনি জানান।
ওকারি জেটি নাইজেরিয়ার তেলসমৃদ্ধ নাইজার ডেল্টা অঞ্চলের রিভার্স স্টেটে অবস্থিত। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ তেল উত্তোলন, পাইপলাইন চুরি ও অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মতো কর্মকাণ্ডের সমস্যায় ভুগছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে পাইপলাইন থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি ইন্দোরামা এলেমে পেট্রোকেমিক্যালস এলাকা হয়ে পোর্ট হারকোর্ট রিফাইনারি করিডোরের দিকে এবং সেখান থেকে রপ্তানির জন্য জাহাজে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
নাইজেরিয়ায় তেল চুরি দেশটির জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। পাইপলাইন কেটে বা অবৈধভাবে সংযোগ স্থাপন করে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য চুরি করার ঘটনা দেশটিতে নিয়মিতই ঘটে।
নাইজেরিয়ার জাতীয় তেল কোম্পানি NNPC Limited-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের নেটওয়ার্কে পাইপলাইন চুরির ১৯টি ঘটনা এবং ২০২৬ সালে জুন পর্যন্ত আরও পাঁচটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।
এই অবৈধ কর্মকাণ্ড শুধু দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, বরং জড়িত ব্যক্তিদের জীবনকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। পাইপলাইনে উচ্চচাপ, বিষাক্ত গ্যাস, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তেল চুরি ও অবৈধ তেল পরিশোধনের বিরুদ্ধে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে রিভার্স স্টেটে দুটি অবৈধ তেল শোধনাগার ধ্বংস এবং বিপুল পরিমাণ সন্দেহভাজন অবৈধভাবে পরিশোধিত জ্বালানি উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে নাইজেরিয়ান নেভি।
এর আগে রিভার্স, ডেল্টা ও আকওয়া ইবোম রাজ্যে অভিযানে ১০টি অবৈধ তেল শোধনাগার ধ্বংস এবং কয়েকজন সন্দেহভাজন তেল চোরকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছিল দেশটির সামরিক বাহিনী।
ওকারি জেটির এই দুর্ঘটনা নাইজেরিয়ার নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে তেলসম্পদকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও জীবিকার সংকটকে আবারও সামনে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই তেলশিল্পের ওপর নির্ভরশীল হলেও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আরও পড়ুন:







