News Ticker
221.png

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতীকী শেষকৃত্য করছে স্বজনরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:০৭

শেয়ার

শেয়ার

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতীকী শেষকৃত্য করছে স্বজনরা
ছবি: সংগৃহীত

প্রিয়জনের মরদেহটিও ফিরে পাননি। তবু অপেক্ষার শেষ নেই। দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, নিখোঁজ স্বজনের কোনো সন্ধান মিলছে না। শেষ পর্যন্ত বুকভরা শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে নেপালের কিছু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য করতে শুরু করেছেন।

গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক জলস্রোতে ব্যাপক প্রাণহানির পর এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে নেপালের বিভিন্ন এলাকায়। বিশেষ করে রাজধানী কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে নিখোঁজ স্বজনদের জন্য প্রতীকী শেষকৃত্য পালন করছেন পরিবারগুলো। 

হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে মৃত ব্যক্তির সৎকারকে গুরুত্বপূর্ণ শেষকৃত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ভয়াবহ বন্যায় অনেক মানুষের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্বজনরা মরদেহের পরিবর্তে কুশ ঘাস দিয়ে তৈরি প্রতীকী অবয়ব ব্যবহার করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করছেন।

পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে এসব প্রতীকী শেষকৃত্যের সময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। কেউ নিখোঁজ স্বামীকে, কেউ ভাইকে, কেউ সন্তানকে ধরে এই প্রতীকী বিদায় জানাচ্ছেন। তাদের অনেকেরই এখন আর প্রিয়জন জীবিত আছেন—এমন আশা করার মতো কোনো খবর নেই।

একজন স্বজনের ভাষায়, প্রিয়জনের আত্মার শান্তির জন্যই তারা এই শেষকৃত্য করতে বাধ্য হয়েছেন। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও যখন কোনো খবর পাওয়া যায়নি, তখন ধর্মীয় রীতি মেনে তাকে বিদায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। 

২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের পর নেপালের হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়। বরফ, পানি, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত বসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। শুধু নেপালেই নিখোঁজের সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি বলে কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। 

তবে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। ফলে নিখোঁজদের সবাই মারা গেছেন—এমন সিদ্ধান্ত এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নিখোঁজ পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগও স্থাপিত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছেন উদ্ধারকারীরা।

কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করা মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের জন্য ছবি, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করছে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু মরদেহ অস্থায়ীভাবে সমাহিত করা হচ্ছে। পরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। 

কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নিখোঁজ ও অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য ও ছবি নিয়ে একটি ‘নিখোঁজদের দেয়াল’ও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে স্বজনরা প্রতিদিন প্রিয়জনের ছবি ও তথ্য খুঁজছেন। 

একদিকে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ, নদী ও ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে তল্লাশি চালাচ্ছেন; অন্যদিকে নিখোঁজদের স্বজনরা হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও নিখোঁজদের তালিকায় প্রিয়জনের নাম খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

অনেক পরিবারের আশা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। আবার কারও কাছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও কোনো খবর না পাওয়ার যন্ত্রণা এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে তারা প্রতীকী শেষকৃত্যের মাধ্যমে প্রিয়জনকে বিদায় জানাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানে আশার আলোও দেখা গেছে। ভয়াবহ বন্যার নয় দিন পর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে দুজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এতে নিখোঁজ অন্যদের নিয়েও কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।

নেপালের এই বিপর্যয় শুধু মানুষের জীবন ও ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে শোক প্রকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও। যেখানে পরিবারের সদস্যরা সাধারণত প্রিয়জনের মরদেহ শেষবারের মতো দেখে ধর্মীয় রীতি পালন করেন, সেখানে এবার অনেককেই মরদেহ ছাড়াই প্রতীকীভাবে শেষ বিদায় জানাতে হচ্ছে।

পশুপতিনাথ মন্দিরে কুশ ঘাসের প্রতীকী অবয়ব নিয়ে শেষকৃত্য পালন সেই গভীর মানবিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে নিখোঁজ স্বজনকে ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আত্মার শান্তির জন্য শেষকৃত্য—এই দুই অনুভূতির মাঝেই দিন কাটাচ্ছেন হাজারো পরিবার। 

সূত্র: আল জাজিরা

ChannelNRB Footer