News Ticker
221.png

পর্বতারোহীদের মূত্রবিসর্জনে গলছে হিমালয়ের বরফ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৫৫

শেয়ার

শেয়ার

পর্বতারোহীদের মূত্রবিসর্জনে গলছে হিমালয়ের বরফ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের পাদদেশে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে দ্রুত গলছে হিমবাহ। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য—পর্বতারোহী ও গাইডদের মূত্র সরাসরি হিমবাহের ওপর ফেলার ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ ও তুষার গলে যাচ্ছে।

গবেষণাটি নেপালের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের নিচে অবস্থিত খুম্বু হিমবাহের ওপর পরিচালিত হয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বসন্তের পর্বতারোহণ মৌসুমে মানুষের ব্যবহারজনিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায় ৩০ লাখ কেজি বা ৩ হাজার টন বরফ ও তুষার গলে যেতে পারে। এর মধ্যে শুধু মানুষের মূত্রের উষ্ণতার কারণে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলার হিসাব পাওয়া গেছে। 

এভারেস্টের উচ্চতায় শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে পর্বতারোহী ও গাইডদের প্রচুর পানি পান করতে হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ মূত্রও তৈরি হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এলাকায় প্রতিদিন ৬ হাজার লিটারের বেশি মূত্র উৎপন্ন হতে পারে। কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে নিচে নামানোর ব্যবস্থা থাকলেও মূত্রের বড় একটি অংশ সরাসরি হিমবাহের বরফের ওপর ফেলা হয়। 

মানুষের শরীর থেকে বের হওয়ার সময় মূত্রের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড ঠান্ডা পরিবেশে সেই উষ্ণ তরল সরাসরি বরফের ওপর পড়লে তাপ স্থানান্তরের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বরফ গলাতে পারে। গবেষকেরা এই তাপের প্রভাব হিসাব করেই মূত্রের কারণে বরফ গলার পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।

গবেষণায় অবশ্য মূত্রকে খুম্বু হিমবাহ গলার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং বেস ক্যাম্পে রান্না, গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি পোড়ানোকে আরও বড় মানবসৃষ্ট তাপের উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে।

২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে বেস ক্যাম্পের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি তাঁবু পরিচালনায় ৮২৪টি এলপিজি সিলিন্ডার, ১৮ হাজার ৯৩৫ লিটার কেরোসিন এবং ৫ হাজার ১৩০ লিটার পেট্রল ব্যবহারের হিসাব পেয়েছেন গবেষকেরা। এসব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন তাপ আনুমানিক ২ হাজার ৩৩৮ টন বরফ ও তুষার গলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে। 

অর্থাৎ, মূত্রের কারণে গলা বরফের পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারের তুলনায় অনেক কম। তবে গবেষকদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ মূত্র সরাসরি হিমবাহের ওপর ফেলা হচ্ছে এবং খুম্বু হিমবাহ স্থানীয় পরিবেশ ও পানির উৎসের সঙ্গেও যুক্ত।

গবেষকেরা ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এলাকায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা পাওয়া গেছে—যা আশপাশের খুম্বু হিমবাহের পৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

গবেষকদের মতে, বেস ক্যাম্পের ক্রমবর্ধমান মানবিক কর্মকাণ্ড এই স্থানীয় উষ্ণতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। পর্বতারোহীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁবু, রান্না, গরম পানি, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য সুবিধার ব্যবহারও বাড়ছে।

তবে এভারেস্টের বরফ গলার বিষয়টি শুধু বেস ক্যাম্পের মানুষের কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের হিমবাহগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বড় হুমকি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বরফধস, হিমবাহ-সৃষ্ট বন্যা ও অন্যান্য পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

নতুন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পকে হিমবাহের ওপর থেকে সরিয়ে তুলনামূলকভাবে বরফমুক্ত ও স্থিতিশীল এলাকায় নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা।

গবেষকদের মতে, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের জন্য এমন একটি পরিবেশে অবস্থান করছেন, যেখানে পরিবেশগত পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুত ঘটে। তাই পর্যটন ও পর্বতারোহণের সুযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ব্যবহার এবং ক্যাম্পের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। 

এভারেস্ট শুধু পর্বতারোহীদের স্বপ্নের গন্তব্য নয়; এটি হিমালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশব্যবস্থার অংশ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক, পর্বতারোহী, গাইড ও কর্মী সেখানে যাওয়ায় পাহাড়ের ওপর মানুষের চাপও বাড়ছে।

নতুন গবেষণাটি দেখাচ্ছে, মানুষের এমন কিছু কর্মকাণ্ডও পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে, যেগুলোকে এতদিন খুব ছোট বিষয় বলে মনে করা হতো। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, মূত্রের প্রভাবকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করে দেখা ঠিক হবে না—এটি স্থানীয় বরফ গলার একটি অতিরিক্ত মানবসৃষ্ট কারণ, মূল বৈশ্বিক হুমকি নয়। 

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ChannelNRB Footer