নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩ জন। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসের পর নেপালের ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ ঢল নেমে এ বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো উদ্ধার ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান অভিযান চলছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পানির সঙ্গে নেমে আসে। ত্রিশূলী নদী ও আশপাশের নদীপথে সৃষ্ট প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন জনপদ, সড়ক, সেতু এবং অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক এলাকায় পানির প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ছিল। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, শ্রমিক ও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিদের অনেকেই নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পাননি।
দুর্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান। সরকারি হিসাবে ৫,০৮৩ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীসহ স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন।
বিশেষ করে নদীর তলদেশ ও পাহাড়ের ভেতরের টানেলগুলোতে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও বরফের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকাজকে ধীর করে দিচ্ছে।
তীব্র বিপর্যয়ের মধ্যেও উদ্ধার অভিযানে আশার আলো দেখিয়েছে একটি ঘটনা। দুর্ঘটনার নয় দিন পর ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সঞ্জয় সাহ ও কবির মহার্জন নামের ওই দুই শ্রমিক প্রায় ১৭০ মিটার গভীরে আটকা ছিলেন। তাঁদের উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন অন্যান্য টানেলেও জীবিত ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে।
বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ত্রিশূলী নদী অববাহিকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে। কয়েকটি প্রকল্পের টানেল ও স্থাপনা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পে শত শত শ্রমিক নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সম্পত্তি, আবাসন ও অবকাঠামো মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি, যা প্রায় ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। অন্তত ৭,৫০০টি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে।
উদ্ধারকারী দলগুলোকে একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক ও সেতুর কারণে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতেও সমস্যা হচ্ছে। নদীপথে ভেসে আসা কাদা ও পাথরের স্তূপ এবং পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ইঞ্জিনিয়ার ও বিশেষজ্ঞদের একটি বড় দলও উদ্ধার অভিযানে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের নকশা, অবস্থান ও কাঠামোগত তথ্য বিশ্লেষণ করে আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। চীনের তিব্বত অঞ্চলেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হিসাবে তিব্বতে ২১ জন নিহত এবং ৫৪১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন এবং ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ।
সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বাসস্থান, নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবেও আগামী কয়েক মাসে সড়ক নির্মাণ, অস্থায়ী আশ্রয়, পানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আরও পড়ুন:







