ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির প্রজাতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে টানা ক্ষমতায় থাকা সরকারে পরিণত হয়েছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) মেলোনির সরকার ১ হাজার ৪১৩ দিন পূর্ণ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনির দ্বিতীয় সরকারের ১ হাজার ৪১২ দিনের রেকর্ড ভেঙে দেয়। এর মধ্য দিয়ে ইতালির যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়িত্বের নতুন মাইলফলক তৈরি হলো।
মেলোনি ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে ডানপন্থি জোট প্রায় চার বছর ধরে বড় ধরনের সরকার সংকট ছাড়াই ক্ষমতায় রয়েছে। ইতালির মতো ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের জন্য পরিচিত একটি দেশে এই দীর্ঘস্থায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এতদিন ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার ছিল সিলভিও বারলুসকোনির দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা। ২০০১ সালের ১১ জুন থেকে ২০০৫ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ওই সরকার ক্ষমতায় ছিল—মোট ১ হাজার ৪১২ দিন।
৪ সেপ্টেম্বর মেলোনির সরকার সেই সময়সীমা এক দিন অতিক্রম করে ১ হাজার ৪১৩ দিনে পৌঁছে যায়। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী একটানা সরকারের রেকর্ড এখন মেলোনির দখলে।
তবে বিষয়টি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত একটানা সরকার হিসেবে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড। মেলোনির আগে ও পরে অন্য নেতারাও একাধিক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ফলে ‘ইতালির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী’ এবং ‘সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী একক সরকার’—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
রেকর্ড অর্জনের পর মেলোনি তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা তুলে ধরেছেন।
শুক্রবার নিজের দল ব্রাদার্স অব ইতালির আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি বলেন, স্থিতিশীলতা শুধু প্রদর্শনের মতো কোনো রেকর্ড নয়; বরং এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে।
বারিতে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে মেলোনি সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব উদযাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ইতালির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি।
মেলোনির সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও কিছু ইতিবাচক সূচকের কথা সামনে আনছে।
সরকারের দাবি, মেলোনি ক্ষমতায় আসার পর কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং বেকারত্ব কমেছে। সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আর্থিক বাজারে আস্থা ফেরানোর বিষয়টিও তাঁর প্রশাসনের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
মেলোনির মতে, তাঁর সরকারের স্থিতিশীলতার কারণে ইতালির প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারদের আস্থা বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের অর্থায়ন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও সরকারের নীতির প্রভাব রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণও মেলোনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে তাঁর সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইউরোপীয় পর্যায়েও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ক্ষমতায় আসার সময় মেলোনিকে ইউরোপের ডানপন্থি রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দেখা হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভের প্রতি সমর্থন বজায় রাখা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রাখার কারণে ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনেও মেলোনির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
তাঁর সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব ইতালিকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবেও তুলে ধরেছে।
তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকাকে মেলোনির সরকার যতটা বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, বিরোধী দল ও সমালোচকদের মূল্যায়ন ততটা ইতিবাচক নয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ইতালির বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল উৎপাদনশীলতা, কম মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা এবং সরকারি প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা।
বিরোধী নেতারা বিশেষ করে সরকারের ‘কাজের গতি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, প্রায় চার বছর ক্ষমতায় থাকার পরও অর্থনীতি ও জনসেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
চলতি বছর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে মেলোনি সরকারের প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হওয়াও সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
মেলোনির রেকর্ড এমন সময়ে তৈরি হলো, যখন ইতালি আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৭ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্ব মেলোনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর সমর্থকদের যুক্তি—ইতালির দীর্ঘদিনের সরকার পরিবর্তনের সংস্কৃতির বিপরীতে মেলোনি একটি স্থিতিশীল জোট ধরে রাখতে পেরেছেন। ফলে ভোটারদের সামনে তিনি ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে পারবেন।
অন্যদিকে বিরোধীদের লক্ষ্য থাকবে, শুধু কত দিন সরকার টিকে আছে তা নয়, ওই সময়ে সরকার মানুষের জীবনযাত্রা, মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পেরেছে—সেই প্রশ্ন সামনে আনা।
এদিকে মেলোনির ডানদিকে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। সাবেক জেনারেল রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন ফুতুরো নাজিওনালে দলটি রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচন মেলোনির জন্য শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নয়, ডানপন্থি ভোটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইও হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







