হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় নিহতদের স্মরণে আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় শোক পালন করছে নেপাল। গত ২৬ আগস্ট দেশটির উত্তরাঞ্চলে ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ভূমিধসের পর এ শোক দিবস ঘোষণা করা হয়।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় শোকের দিনে নেপালের সরকারি কার্যালয়গুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। বিদেশে থাকা নেপালের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও পতাকা অর্ধনমিত রাখা হচ্ছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নেপালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪০ জনের বেশি মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে ১ হাজার ৩৪২টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। তবে অন্য সরকারি আপডেটে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা আরও বেশি—১ হাজার ৩৫৫—বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজদের অনেকেই নেপালের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দা। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে।
নেপালে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে মৃত্যুর পর ১৩তম দিনটি শোক পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভয়াবহ বন্যার ১৩তম দিনে জাতীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত সেই ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশে অবস্থিত নেপালি কূটনৈতিক মিশনগুলোতে পতাকা অর্ধনমিত রাখার মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বহু পরিবার নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিহত স্বজনদের শেষকৃত্য ও স্মরণানুষ্ঠান পালন করছে।
জাতীয় শোক পালনের মধ্যেও উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়নি। বরং যেসব এলাকায় এখনো মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন, সেসব স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বেত্রাওয়াতি এলাকায় ১০ দিন ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির ভেতরে আটকে থাকার পর এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে তাঁর কণ্ঠ শুনে অভিযান চালিয়ে তাকে বের করে আনেন।
বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের উত্তরাঞ্চলের বহু বসতি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কিছু এলাকায় পুরো জনপদ কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০ হাজার বাড়ি ধ্বংস বা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং অন্তত ৭ হাজার ৫০০ বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন নেপাল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দুর্যোগে শুধু প্রাণহানি নয়, নিখোঁজ স্বজনদের নিয়ে অনিশ্চয়তাও ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। অনেক পরিবার এখনো প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পেয়ে অপেক্ষা করছে। কারও মরদেহ উদ্ধার না হওয়ায় কিছু পরিবার প্রতীকী শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে।
উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ও ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করছে। এতে ভবিষ্যতে নিখোঁজদের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর ও পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালকে সহায়তা করছে বিভিন্ন দেশ। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়াদের উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:







