ইন্দোনেশিয়ার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আনাক ক্রাকাতাউ থেকে অগ্ন্যুৎপাত ও ব্যাপক ছাই ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আগ্নেয় ছাইয়ের কারণে রাজধানী জাকার্তাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। এতে কয়েক হাজার ফ্লাইট বাতিল, বিলম্বিত বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি যাত্রী ভ্রমণ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এর আগে রোববার পর্যন্ত আটটি বিমানবন্দরে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী এবং ১ হাজার ৫০০-এর বেশি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। সোমবার নতুন করে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও ডাইভারশনের পর মোট প্রভাবিত যাত্রীর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
শুক্রবার রাত থেকে আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এরপর শনিবার ও রোববার একাধিক অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাইয়ের মেঘ একদিকে জাভা, অন্যদিকে সুমাত্রার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, ছাইয়ের মেঘ জাভা অংশে প্রায় ৬ হাজার মিটার এবং সুমাত্রা ও বানতেনের কিছু এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার মিটার বা ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
এ ধরনের আগ্নেয় ছাই উড়োজাহাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ছাই বিমানের ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে, পাশাপাশি পাইলটের দৃশ্যমানতাও কমিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান চলাচল বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে।
অগ্ন্যুৎপাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জাকার্তার সোকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বারবার বন্ধের সময় বাড়ানো হয়েছে। সোমবারও বিমানবন্দরটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া জাকার্তার হালিম পারদানাকুসুমা বিমানবন্দরসহ আরও কয়েকটি বিমানবন্দর ছাইয়ের কারণে কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। দক্ষিণ সুমাত্রার একটি বিমানবন্দর অবশ্য সোমবার সকালে পুনরায় চালু করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সোমবার পর্যন্ত বাতিল, বিলম্বিত কিংবা অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া ফ্লাইট মিলিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সোমবার সকালেই শুধু সোকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দরে ২৪০টির বেশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয় এবং প্রায় ৩০ হাজার যাত্রী এতে আক্রান্ত হন।
রোববার পর্যন্ত আটটি বিমানবন্দরে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে জাকার্তার প্রধান বিমানবন্দরকে ঘিরেই প্রায় ৯০০ ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
বিমান চলাচল সচল রাখতে ইন্দোনেশিয়া সরকার কয়েকটি বিকল্প বিমানবন্দর প্রস্তুত করেছে। এসব বিমানবন্দরের মধ্যে রয়েছে কের্তজাতি, আহমাদ ইয়ানি, জুয়ান্ডা, যোগ্যাকার্তা আন্তর্জাতিক এবং আদি সোয়েমার্মো বিমানবন্দর। কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আটকে পড়া যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠানো যায়।
এয়ারলাইনগুলোকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ফ্লাইট পুনর্বিন্যাস, যাত্রীদের পুনরায় বুকিং এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
অগ্ন্যুৎপাতের ছাই শুধু বিমান চলাচলেই প্রভাব ফেলেনি; স্থানীয় জনজীবনেও এর প্রভাব পড়েছে। ছাইয়ের কারণে চোখে জ্বালাপোড়া ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ায় জাকার্তাসহ কয়েকটি এলাকায় স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। মাছ ধরার কার্যক্রমও কিছু এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে এবং আগ্নেয়গিরির আশপাশে সতর্ক থাকতে বলেছে।
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবি ছাইয়ের ঘনত্ব কমাতে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ বা ক্লাউড সিডিং কার্যক্রমের উদ্যোগ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশা, পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে বাতাসে থাকা আগ্নেয় ছাই দ্রুত মাটিতে নেমে আসবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ায় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নতুন ঘটনা নয়। তবে আনাক ক্রাকাতাউয়ের বর্তমান অগ্ন্যুৎপাতের ছাই জাকার্তাসহ ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছে যাওয়ায় পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







