যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন ঠেকানোর দাবিতে দুই দিনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী যান চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) পোর্টসমাউথে প্রায় ১৪০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী একটি নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর সেখানে কয়েক শ মানুষ বিক্ষোভে জড়ো হন। এর একদিন আগে শনিবার ডোভারের বন্দরসংলগ্ন এলাকাতেও মুখ ঢাকা ও কালো পোশাক পরা বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন।
রোববার ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলীয় এলাকা থেকে একটি নৌকায় করে প্রায় ১৪০ জন চ্যানেল পেরিয়ে পোর্টসমাউথের কাছে পৌঁছান। তাদের নিরাপদে তীরে নেওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়াকেন্দ্রে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
এ সময় শত শত অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী সেখানে জড়ো হন। তাদের অনেকের মুখে বালাক্লাভা বা মুখঢাকা পোশাক ছিল। তারা সড়ক অবরোধ করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী বাস আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম নিয়ে অবস্থান নেয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে উত্তেজনা চলার পর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নির্ধারিত প্রক্রিয়াকেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়।
বিক্ষোভের সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত এবং পুলিশের যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশ অভিযান চালায়।
এর আগে শনিবার যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ফেরি বন্দর ডোভারে একই ধরনের বিক্ষোভ হয়। শত শত মুখঢাকা বিক্ষোভকারী বন্দরের দিকে যাওয়া প্রধান সড়কগুলোতে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
বিক্ষোভকারীরা ‘বোট বন্ধ করো’—এমন স্লোগান দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ফলে বন্দর এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয় এবং ফেরি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। পরে পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
ডোভার যুক্তরাজ্যের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক ফেরি বন্দর হওয়ায় সেখানে বিক্ষোভের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
পোর্টসমাউথের বিক্ষোভের পর যুক্তরাজ্য সরকার বিক্ষোভকারীদের আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ট্রেজারির চিফ সেক্রেটারি এমা রেনল্ডস বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘ভীতিপ্রদর্শনমূলক ও উচ্ছৃঙ্খল’ আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক অংশ হলেও তা বিশৃঙ্খলা বা আইনভঙ্গের পর্যায়ে যেতে পারে না।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পোর্টসমাউথের ঘটনাকে ‘ভীতিপ্রদর্শনমূলক ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে সম্মান করা হলেও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা জনসাধারণের চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।
যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। সাধারণত ফ্রান্সের কালাইস ও ডোভারের মধ্যকার অপেক্ষাকৃত সরু জলপথটি এ ধরনের যাত্রার জন্য বেশি ব্যবহৃত হয়।
তবে এবার নরম্যান্ডি থেকে পোর্টসমাউথের দিকে প্রায় ১৪০ জনের যাত্রা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন রুট ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। হ্যাম্পশায়ার ও আইল অব ওয়াইটের পুলিশ ও ক্রাইম কমিশনার ডোনা জোন্স আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পোর্টসমাউথ ভবিষ্যতে মানবপাচারকারীদের জন্য নতুন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ হাজার ৫১৩ জন অনিয়মিত অভিবাসী ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কম।
সরকার ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সীমান্ত ও আশ্রয়ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি কমানোর চেষ্টা করছে। তবে নতুন রুটে নৌকা আসার ঘটনা এবং তা ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো শুধু অভিবাসন নীতির প্রতিবাদ নয়, বরং জনমনে আতঙ্ক ও বিভাজন তৈরির ঝুঁকিও সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, অবৈধভাবে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে তারা কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার কথা জানিয়ে সরকার স্পষ্ট করেছে—পুলিশকে বাধা দেওয়া, সড়ক অবরোধ কিংবা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের চলাচল ঠেকাতে জোর প্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







