হঠাৎ করেই দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার। কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) পুরো দিন পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়। তবে এক দিনের অচলাবস্থার পর মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আবারও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই স্থাপনাটি।
আইফেল টাওয়ার বন্ধের পেছনে ছিল নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কর্মীদের ক্ষোভ। একটি হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি দলের ব্যক্তিগত সফরের সময় নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর), যখন প্রায় ১০০ সদস্যের একটি হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি দল আইফেল টাওয়ারে ব্যক্তিগত সফরে যায়। দলটি বোচাসানওয়াসি অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামিনারায়ণ সংস্থা (BAPS)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কর্মী ইউনিয়নের অভিযোগ, প্রতিনিধি দলটি যাওয়ার সময় কয়েকজন নারী কর্মীকে তাদের কর্মস্থল থেকে সরে যেতে বলা হয় এবং তাদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগটি কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে।
ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারী কর্মীদের এমনভাবে সরিয়ে দেওয়াকে তারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য হিসেবে দেখেছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদেই কর্মীরা সোমবার কাজ বন্ধ করে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান SETE পরে স্বীকার করেছে যে হিন্দু প্রতিনিধি দলটির পক্ষ থেকে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল এবং সেই শর্ত মেনে নেওয়া উচিত হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এমন ব্যবস্থা নারী-পুরুষের সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর BAPS-এর পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধি দলের সফরের উদ্দেশ্য ছিল ভিড় ও অন্য দর্শনার্থীদের অসুবিধা এড়ানো। এ কারণে দিনের শুরুতেই সফরটি আয়োজন করা হয়েছিল।
তবে সংগঠনটির বক্তব্য, তাদের জানা মতে কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে ঘটনার কারণে কেউ কষ্ট বা অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে প্যারিস কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেছেন, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি দ্রুত খতিয়ে দেখা হবে।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে বলেছেন, অন্যকে স্বাগত জানানো মানে নিজেদের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়। ফ্রান্সে নারীদের জনজীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে ৭ সেপ্টেম্বর আইফেল টাওয়ার দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল। এতে সেখানে আসা বহু পর্যটক ভোগান্তিতে পড়েন। সাধারণত বছরে প্রায় ৭০ লাখ দর্শনার্থী আইফেল টাওয়ারে যান।
কর্মী ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে আলোচনার পর মঙ্গলবার সকালে আবার টাওয়ারের কার্যক্রম শুরু হয়। দর্শনার্থীদের প্রবেশও স্বাভাবিক হয়েছে।
আইফেল টাওয়ারের এই ঘটনা ফ্রান্সে ধর্মীয় স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা এবং সরকারি পর্যটনস্থানে নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
একদিকে ধর্মীয় প্রতিনিধি দলের বিশেষ অনুরোধকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার নীতি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। কর্তৃপক্ষের তদন্তে ঘটনার পুরো চিত্র স্পষ্ট হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।
তবে আপাতত ধর্মঘটের অবসান হয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পর্যটন স্থাপনা আইফেল টাওয়ার আবার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







