ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বিমান চলাচল খাতকে সহায়তা এবং দেশটির জন্য অস্ত্র, জনবল ও অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহযোগিতার অভিযোগে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি উড়োজাহাজ, বিমানযন্ত্রাংশ ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এ কাজে দেশটি বিভিন্ন ফ্রন্ট কোম্পানি, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী এবং গোপন পণ্য স্থানান্তর বা ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এসব নেটওয়ার্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় ২৭টি ইরানি এয়ারলাইনকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিমান সংস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এয়ারলাইন ইরানের বিমান খাতের মাধ্যমে অস্ত্র, সামরিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং অবৈধ কার্গো পরিবহনে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বিশেষভাবে Mahan Air-কে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, বিভিন্ন দেশের কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারীরা Mahan Air-এর জন্য বিমান, যন্ত্রাংশ ও লজিস্টিক সহায়তা সংগ্রহে ভূমিকা রেখেছে।
নিষেধাজ্ঞা শুধু ইরানি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও মালয়েশিয়াভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইরানের বিমান খাতকে যন্ত্রাংশ, কার্গো পরিবহন ও অন্যান্য লজিস্টিক সেবা দিয়েছে।
বিশেষ করে Mahan Air-এর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সচল রাখতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সহায়তার বিষয়টি সামনে এনেছে মার্কিন ট্রেজারি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে Mahan Air-এর জন্য অন্তত তিনটি Boeing 777 উড়োজাহাজ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এসব নেটওয়ার্ক ভূমিকা রেখেছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘Operation Economic Outcast’ নামের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইরানের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ শুধু ইরানি কোম্পানি নয়, তাদের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ও সেবা প্রদানকারীরাও ওয়াশিংটনের নজরদারিতে রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (OFAC) ইরানের বিমান চলাচল-সংক্রান্ত তিনটি অনুমোদনও স্থগিত করেছে। এসব অনুমোদনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার এবং যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ইরানে পরিচালনার সুযোগ ছিল।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন সম্পদ সাধারণভাবে জব্দ বা ব্লক করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন সীমিত বা নিষিদ্ধ হবে।
এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে গেলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ইরানের বিমান খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং কার্গো ও লজিস্টিক কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
Mahan Air দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এয়ারলাইনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। পরে ওয়াশিংটন অভিযোগ করে, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে এবং সামরিক সরঞ্জাম ও personnel পরিবহনে ব্যবহৃত হয়েছে।
সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে Mahan Air-এর সরাসরি কার্যক্রমের পাশাপাশি এর বিমান সংগ্রহ, কার্গো পরিবহন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক সেবা নেটওয়ার্ককে দুর্বল করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা এলো। ওয়াশিংটন একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করছে, অন্যদিকে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বিমান খাতকে লক্ষ্য করে এবারের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য শুধু কয়েকটি এয়ারলাইনকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং ইরানের বিমান চলাচল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও আর্থিক নেটওয়ার্ককে বিচ্ছিন্ন করা।
আরও পড়ুন:







