অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান সায়মা ওয়াজেদ। তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি রয়টার্স-এর হাতে আসা পদত্যাগপত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সায়মার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ডব্লিউএইচও—দুই পক্ষের পর্যায়েই বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত চলছিল। এর মধ্যে চীন সফরের ভ্রমণ ব্যয়ে আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া এবং বাংলাদেশে জমি অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সায়মা।
ডব্লিউএইচওর অভিযোগের অন্যতম বিষয় চীন সফরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ ব্যয়। ২০২৬ সালের ৩ জুলাই সায়মার আইনজীবীরা ডব্লিউএইচওকে যে চিঠি দেন, সেখানে সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ তোলার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে সায়মার আইনজীবীরা অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভ্রমণ ব্যয়ের দাবিতে যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, তা ছিল একজন সহকারীর মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ভুল। সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ মার্কিন ডলার।
সায়মার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে একাডেমিক যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ করেছে। তবে সায়মা এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং এ যোগ্যতার বিষয়টি তিনি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোসের কাছে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছিলেন।
পদত্যাগপত্রে সায়মা আরও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তুলেছে ডব্লিউএইচও।
এই অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় তিনি ওই সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন বলেও দাবি করেন সায়মা।
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের শুরুতে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও নথি জাল করার অভিযোগ আনে। এর পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে তিনি বেতনহীন প্রশাসনিক ছুটিতে ছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ার বিষয়টিও পদত্যাগপত্রে তুলে ধরেছেন সায়মা।
পদত্যাগপত্রে ডব্লিউএইচও নেতৃত্বের প্রতি নিজের অসন্তোষের কথাও স্পষ্টভাবে জানান সায়মা।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দেওয়ায় ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস আর নেই। দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ার কারণে তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি।
সায়মার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সেই দায়িত্ব আন্তরিকভাবে পালন করেছেন। কিন্তু কার্যকরভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ায় তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সায়মার পদত্যাগের পর ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্য নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী আগামী ১২ অক্টোবর নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ডিসেম্বরে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এবং আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন হতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদটি ডব্লিউএইচওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের অবস্থান। এই পদের অধিকারী আঞ্চলিক পর্যায়ে রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয় এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







