চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক মাইলফলক তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের নাগরিক টিম অ্যান্ড্রুজ। জিনগতভাবে পরিবর্তিত একটি শূকরের কিডনি শরীরে প্রতিস্থাপনের পর তিনি ২৭১ দিন ডায়ালাইসিস ছাড়াই বেঁচে ছিলেন। এরপর তাঁর শরীরে সফলভাবে মানবদাতার একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিই প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা, যেখানে একজন রোগী জিন-সম্পাদিত শূকরের কিডনিকে সাময়িক ‘সেতু’ হিসেবে ব্যবহার করার পর মানবদাতার কিডনি পেয়েছেন। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে মানব কিডনির সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টিম অ্যান্ড্রুজের শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগ ছিল। ডায়াবেটিসজনিত কিডনি জটিলতার কারণে তাঁর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল না এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হচ্ছিল।
একই সঙ্গে মানবদাতার কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম ছিল। চিকিৎসকদের হিসাবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানব কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষামূলক জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের সুযোগ নেন তিনি।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে অ্যান্ড্রুজের শরীরে একটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
দাতা শূকরটি ছিল একটি জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত ইয়ুকাটান মিনিয়েচার পিগ। গবেষকেরা এর জিনে ৬৯টি পরিবর্তন করেছিলেন। এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যাতে কিডনিটিকে সহজে প্রত্যাখ্যান না করে এবং সম্ভাব্য শূকরজাত ভাইরাসের ঝুঁকি কমানো।
প্রতিস্থাপনের পর কিডনিটি দ্রুত কাজ শুরু করে। অ্যান্ড্রুজ আবার স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনেকটাই ফিরে পান এবং ডায়ালাইসিস থেকে মুক্ত থাকেন।
শূকরের কিডনিটি অ্যান্ড্রুজের শরীরে ২৭১ দিন কার্যকর ছিল। প্রায় নয় মাস তিনি ওই কিডনির ওপর নির্ভর করে ডায়ালাইসিস ছাড়াই জীবন কাটান।
তবে প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালিতে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেয়। পরে সমস্যাটি আরও বাড়তে থাকায় কিডনিটির কার্যকারিতা কমে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের অক্টোবরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শূকরের কিডনিটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর অ্যান্ড্রুজকে আবার ডায়ালাইসিসে ফিরতে হয়।
শূকরের কিডনি অপসারণের পর অ্যান্ড্রুজ মানবদাতার কিডনির অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর শরীরে একটি মানব কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
নতুন কিডনিটি ভালোভাবে কাজ করে এবং চিকিৎসকেরা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন। কারণ শূকরের কিডনি ব্যবহার করার পর মানব কিডনি প্রতিস্থাপন সফল হবে কি না, তা নিয়েও আগে অনিশ্চয়তা ছিল।
এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শূকরের কিডনিটি অ্যান্ড্রুজের জন্য স্থায়ী প্রতিস্থাপন ছিল না। এটি তাঁকে মানবদাতার কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত সময় দিয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের পদ্ধতিকে ‘ব্রিজ থেরাপি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, মানব কিডনি না পাওয়া পর্যন্ত জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর কিডনি ব্যবহার করে রোগীকে ডায়ালাইসিসমুক্ত রাখা।
ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. লিওনার্দো রিয়েলার মতে, মানব অঙ্গের ঘাটতি প্রতিস্থাপন চিকিৎসার অন্যতম বড় সংকট। জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন প্রথম পর্যায়ে মানব কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীদের জন্য একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।
শূকরকে মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপনের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের অঙ্গের আকার ও কিছু শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য মানুষের অঙ্গের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু বড় সমস্যা হলো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা। মানুষের শরীর অন্য প্রজাতির অঙ্গকে বিদেশি বস্তু হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা জিন-সম্পাদনার মাধ্যমে শূকরের অঙ্গকে মানবদেহের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছেন। অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিডনিতে জিনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশেষ ধরনের রোগপ্রতিরোধ-দমনকারী ওষুধও ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন থাকা রোগীর সংখ্যা মানবদাতার অঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রেই ৯৫ হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। ২০২৫ সালে দেশটিতে ২৮ হাজারেরও কম কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।
অঙ্গের এই ঘাটতির কারণে অনেক রোগীকে বছরের পর বছর ডায়ালাইসিস করতে হয়। ডায়ালাইসিস জীবন রক্ষা করলেও এটি সময়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগীর শরীরের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই জায়গায় জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর অঙ্গ ভবিষ্যতে নতুন সমাধান দিতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
টিম অ্যান্ড্রুজের ২৭১ দিনের ঘটনা ঐতিহাসিক হলেও সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে এটি আর শূকরের কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ রেকর্ড নয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আরেক মার্কিন নারী জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি নিয়ে ২৮৫ দিন পার করেছেন এবং কিডনিটি তখনও কাজ করছিল। ফলে অ্যান্ড্রুজের ২৭১ দিনের রেকর্ড ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে অ্যান্ড্রুজের ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাঁর ক্ষেত্রেই প্রথমবার সফলভাবে শূকরের কিডনি ব্যবহারের পর মানবদাতার কিডনিতে স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার কথাও বলছেন। অ্যান্ড্রুজের ঘটনা একটি মাত্র রোগীর ওপর ভিত্তি করে পাওয়া ফলাফল। তাই এটিকে এখনই সাধারণ চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অঙ্গের স্থায়িত্ব, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া এবং সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা আপাতত লক্ষ্য করছেন—শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে অন্তত এক বছর নিরাপদ ও কার্যকর রাখা যায় কি না।
টিম অ্যান্ড্রুজের ঘটনা দেখিয়েছে, জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে এমন অঙ্গ মানবদাতার কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার ‘ব্রিজ’ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
মানব অঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সময়ে এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে হাজারো রোগীর চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার প্রয়োজন। অ্যান্ড্রুজের ২৭১ দিনের অভিজ্ঞতা সেই দীর্ঘ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন:







