সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে আলজেরিয়া। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখার সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি টেলিভিশনে প্রকাশিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমিরাতের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘উসকানিমূলক বা বৈরী’ কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। আলজেরিয়া এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একাধিকবার সতর্ক করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক আর স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত নেয় আলজেরীয় সরকার।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আলজেরিয়ায় নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূতকে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। সেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্নের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রদূতকে আলজেরিয়া ছাড়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আলজেরিয়া ও আমিরাতের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ক্রমেই অবনতি হয়েছে। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষ করে পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে আলজেরিয়া ও আমিরাত কার্যত বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। আমিরাত পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের দাবিকে সমর্থন করে। অন্যদিকে আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্টের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে।
এ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়েও দুই দেশের নীতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। আলজেরিয়া অবশ্য ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলেও আলজেরিয়া ও আমিরাতের স্বার্থের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পার্থক্য দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমিরাত ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সামরিক অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আলজেরিয়ার কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়েছে।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেববুন গত বছর উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার সময় সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারের সঙ্গে সম্পর্ককে বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। একই সময়ে একটি উপসাগরীয় দেশের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ করেছিলেন—যা ব্যাপকভাবে আমিরাতকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছিল।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের আগেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির আরও কিছু লক্ষণ দেখা যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আলজেরিয়া আমিরাতের সঙ্গে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত একটি বিমান চলাচল চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে।
আলজেরিয়ার ঘোষণার পর আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কূটনীতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি সরাসরি আলজেরিয়ার নাম উল্লেখ না করলেও বলেন, সফল কূটনীতি নির্ভর করে যুক্তিবোধ, যোগাযোগ, স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর।
তবে এখন পর্যন্ত আমিরাতের পক্ষ থেকে আলজেরিয়ার ঘোষণার জবাবে সম্পর্ক ছিন্নের বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
আলজেরিয়া উত্তর আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। অন্যদিকে আমিরাত উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি। ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; উত্তর আফ্রিকা, সাহেল এবং আরব বিশ্বের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে পশ্চিম সাহারা ইস্যু, মরক্কো-আলজেরিয়া বৈরিতা এবং সাহেল অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







