দুই যুগ পেরিয়ে আজ ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা—৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী। ২০০১ সালের ওই দিনে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, ওয়াশিংটনের পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার একটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন। আল-কায়েদার পরিকল্পনায় পরিচালিত এই হামলা পরবর্তী ২৫ বছরে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে বদলে দেয়।
তবে এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটি অংশের প্রশ্ন শেষ হয়নি। হামলার আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কী তথ্য ছিল, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে কোথায় ব্যর্থতা হয়েছিল এবং হামলার সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা বা অর্থায়নের অভিযোগের পুরো চিত্র কী—এসব নিয়ে এখনো আইনি ও জনপরিসরে বিতর্ক রয়েছে।
৯/১১ কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি ছিল। কমিশন জানিয়েছিল, তাদের প্রতিবেদন ছিল ঘটনাগুলোর একটি বিস্তৃত হিসাব, তবে সব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সব নথি তারা পরীক্ষা করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধিরাও কমিশনের কাছে বিপুলসংখ্যক প্রশ্ন জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে কিছু গবেষণা ও পরিবার-সংশ্লিষ্ট সংগঠন দাবি করে, তাদের অনেক প্রশ্ন কমিশনের তদন্তে পূর্ণাঙ্গভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। তবে এসব দাবির সবকটিকে সরকারি তদন্তের স্বীকৃত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না।
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো হামলাকারীদের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য যোগাযোগ ছিল কি না।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে সহায়তা করেছিলেন। সৌদি সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল বিচারক মামলাটি বিচারের পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। ফলে ২৫ বছর পরও বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিবারগুলোর ক্ষোভের মূল জায়গা এখানেই—তাদের অনেকের কাছে ২৫ বছর অপেক্ষা করা শুধু দীর্ঘ সময় নয়, ন্যায়বিচারের জন্য একটি অসমাপ্ত যাত্রা।
২৫তম বার্ষিকীর আগে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন ৯/১১-পরবর্তী স্বাস্থ্য, বায়ুদূষণ এবং সরকারি প্রতিক্রিয়া-সংক্রান্ত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পৃষ্ঠার নথি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এসব নথির মধ্যে আগে জনসাধারণের নাগালের বাইরে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডও রয়েছে।
বিশেষ করে ধ্বংসস্তূপের বিষাক্ত ধুলা ও দূষণের কারণে উদ্ধারকর্মী, বেঁচে যাওয়া মানুষ এবং আশপাশের বাসিন্দাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বহু বছর ধরে প্রশ্ন ছিল। নতুন নথি প্রকাশের ফলে হামলার পর সরকারের কী জানা ছিল, কখন জানা ছিল এবং কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
৯/১১-এর ক্ষত শুধু ইতিহাসের পাতায় আটকে নেই। নিউইয়র্কের চিকিৎসা পরীক্ষকের কার্যালয় আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখনও হামলায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালেও নতুন করে একজন ভুক্তভোগীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ ২৫ বছর পরও কিছু পরিবারের জন্য ৯/১১-এর গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়নি।
২০০১ সালে যারা শিশু ছিল, তাদের অনেকেই এখন মধ্যবয়সী। আর যারা হামলার সময় জন্মই নেয়নি, তাদের কাছে ৯/১১ সরাসরি স্মৃতির বদলে ইতিহাসের একটি অধ্যায়। ২৫তম বার্ষিকীতে নতুন প্রজন্মের মানুষের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হামলার প্রভাব তাদের কাছে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, অভিবাসন, রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন:







