প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি। চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের মাসের তুলনায় ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। অথচ অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল, জুলাইয়ে অর্থনীতি কোনো প্রবৃদ্ধি দেখাবে না। নতুন এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে সেবা খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউড কম্পিউটিং-সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ব্যবসা।
যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ONS) শুক্রবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানিয়েছে। জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি জুনের ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধির পর এসেছে এবং অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মাসভিত্তিক ০.৪ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা গড়ে কোনো প্রবৃদ্ধি হবে না বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ফলে প্রকাশিত তথ্যকে অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বছরভিত্তিক হিসাবেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের জিডিপি এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ১.৬ শতাংশ বেশি, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে দ্রুত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল ১.২ শতাংশ।
এবারের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এআইয়ের প্রভাব। ONS জানিয়েছে, জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ছিল সবচেয়ে বড় অবদান রাখা খাতগুলোর একটি। এই খাতের যেসব প্রতিষ্ঠান জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি টার্নওভার বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে, তাদের অনেকেই এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিং-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
গত কয়েক মাস ধরেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় শক্তিশালী কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। এর ফলে এআইভিত্তিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাস্তব প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ডয়চে ব্যাংকের প্রধান যুক্তরাজ্য অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় রাজা বলেন, টেলিকম ও তথ্যসেবা খাতে এআই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তি খাতনির্ভর ছিল না। সামগ্রিকভাবে সেবা খাত ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। প্রশাসনিক সেবা, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও পরামর্শক কার্যক্রম এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
এ ছাড়া গবেষণা ও উন্নয়ন, ভাড়া ও লিজিং কার্যক্রমও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায় কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে।
জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের শিল্প উৎপাদনও ০.২ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি খনি ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ খাতের পতনকে আংশিকভাবে পুষিয়ে দিয়েছে।
তবে নির্মাণ খাত ও অর্থনীতির কিছু ঐতিহ্যবাহী অংশ এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির শক্তিশালী চিত্রের মধ্যেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।
ONS জানিয়েছে, জুলাইয়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়ারও কিছুটা প্রভাব ছিল। তবে এই প্রভাব সব খাতে সমান ছিল না—কিছু ব্যবসা উপকৃত হলেও কিছু খাতে উষ্ণ আবহাওয়া কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অর্থাৎ, জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধির পুরোটা শুধু এআইয়ের কারণে হয়েছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে প্রযুক্তি ও এআই-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সরকারি পরিসংখ্যান সেটি স্পষ্ট করছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মোট ১ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, এই সময়ে জি৭-এর বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে দ্রুত ছিল।
এতে সরকারের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে। অতীতেও যুক্তরাজ্যে বছরের প্রথমার্ধে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর দ্বিতীয়ার্ধে ধীরগতি দেখা গেছে।
এআইয়ের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, তথ্যপ্রযুক্তি, পেশাদারি সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা হলো দুর্বল উৎপাদনশীলতা। তবে সাম্প্রতিক তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, এআই ও নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতির ভালো খবরের পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
এতে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে। ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।
শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির তথ্য যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের জন্যও নতুন হিসাব তৈরি করছে। বাজারে এখন বছরের শেষ দিকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। তবে আগামী বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনাই বেশি বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি অবশ্য সতর্ক করেছেন যে বাজারে সুদের হার বৃদ্ধির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ জ্বালানি মূল্য নিয়ে ঝুঁকির প্রতিফলন।
অপ্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির এই তথ্য নতুন অর্থমন্ত্রী জন হিলির জন্য স্বস্তির খবর। আগামী ২৮ অক্টোবর তার প্রথম বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই গতি সরকারের জন্য ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তাও তৈরি করতে পারে।
তবে সরকার নিজেও স্বীকার করছে, প্রবৃদ্ধি এখনো ভঙ্গুর। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







