একটি আপেল, এক কামড় এবং সেই কামড়েই বেরিয়ে এসেছিল শতাব্দীর অন্যতম চাঞ্চল্যকর হিরা চুরির রহস্য। ঘটনাটি প্রায় ১০০ বছর আগের। ১৯২৬ সালে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শাতো দ্য শঁতিই (Château de Chantilly) থেকে চুরি হয়েছিল বিখ্যাত গোলাপি হিরা Grand Condé। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরও ৭৫টির বেশি অলংকার।
দুর্ধর্ষ এই চুরির রহস্য শেষ পর্যন্ত কোনো গোয়েন্দার জটিল তদন্তে নয়, বরং এক ক্ষুধার্ত হোটেল পরিচারিকার একটি আপেল খাওয়ার সিদ্ধান্তে ফাঁস হয়ে যায়।
১৯২৬ সালের অক্টোবরে প্যারিসের উত্তরে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শাতো দ্য শঁতিইয়ের জাদুঘরে হানা দেয় দুই তরুণ চোর—লেওঁ কফার (Léon Kauffer) ও এমিল সুতের (Émile Souter)। দুজনই সাবেক ফরাসি বিমানবাহিনীর সদস্য ছিলেন।
চোরদের কৌশল প্রথমে তদন্তকারীদের রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, এত বড় একটি চুরির পেছনে নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ অপরাধীচক্র, দক্ষ কসরতবাজ কিংবা জাদুঘরের ভেতরের কারও যোগসাজশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দুই চোর মই ব্যবহার করেই জাদুঘরে ঢুকে বিপুল পরিমাণ গয়না নিয়ে পালিয়েছিল।
সব মিলিয়ে ৭৫টির বেশি গয়না চুরি হয়। সে সময় পুরো লুটের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার—তৎকালীন হিসাবে বিপুল অর্থ।
চোরদের লুটের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুগুলোর একটি ছিল ৯.০১ ক্যারেটের গোলাপি Grand Condé হিরা। এটি ছিল ফ্রান্সের অন্যতম বিখ্যাত ঐতিহাসিক রত্ন।
কিন্তু বিপুল মূল্যবান হলেও হিরাটি চোরদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি এতটাই পরিচিত ছিল যে ইউরোপের বড় বড় জুয়েলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে এর পরিচয় গোপন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে চোরেরা এটি বৈধ বাজারে বিক্রি করতে পারেনি।
অন্যদিকে, চুরি করা অন্যান্য গয়নারও খুব সামান্য অংশ বিক্রি করতে পেরেছিল তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো লুটের বিপরীতে তারা পেয়েছিল মাত্র প্রায় ৩০ হাজার ফ্রাঁ।
পুলিশের তৎপরতা বাড়তে থাকায় চোরেরা Grand Condé হিরাটি লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত তাদের মাথায় আসে অদ্ভুত এক কৌশল—একটি আপেলের ভেতর হিরাটি লুকিয়ে রাখা।
আপেলটি রেখে দেওয়া হয় প্যারিসের একটি হোটেলের কক্ষে। চোরেরা সম্ভবত ভাবেনি, এত সাধারণ একটি ফলই শেষ পর্যন্ত তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেবে।
সেই হোটেলের কক্ষ পরিষ্কার করছিলেন পরিচারিকা সুজান শিল্টজ (Suzanne Schiltz)। ঘর পরিষ্কার করার সময় তিনি অতিথিদের লাগেজের মধ্যে একটি আপেল দেখতে পান।
ক্ষুধার্ত শিল্টজ আপেলটি খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আপেলে কামড় দিতেই ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। তার দাঁত একটি অস্বাভাবিক শক্ত বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। প্রায় দাঁত ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থায় তিনি বুঝতে পারেন, আপেলের ভেতরে লুকানো রয়েছে একটি মূল্যবান পাথর।
সেটিই ছিল চুরি যাওয়া Grand Condé হিরা।
অর্থাৎ, পুলিশি তল্লাশি বা কোনো বিশেষ গোয়েন্দা কৌশল নয়—একজন ক্ষুধার্ত পরিচারিকার আপেলে দেওয়া কামড়ই শেষ পর্যন্ত চোরদের গোপন আস্তানা প্রকাশ করে দেয়।
হিরাটি উদ্ধারের পর তদন্তকারীরা চোরদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। দুই তরুণের করা চুরির ঘটনা তখন ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
চোরেরা যে এত বড় একটি ঐতিহাসিক রত্ন চুরি করেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের বিপদে ফেলে। সাধারণ কোনো গয়নার মতো Grand Condé বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। এর পরিচিতি এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বাজারে এটি বিক্রি করতে গেলেই সন্দেহ তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
Grand Condé একটি ৯.০১ ক্যারেটের গোলাপি, নাশপাতি-আকৃতির হিরা। এর ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো এবং এটি ফ্রান্সের Condé পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিল।
হিরাটির সঠিক উৎস নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারত, বোর্নিও ও ব্রাজিল—বিভিন্ন সম্ভাব্য উৎসের কথা ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে। পরে এটি ফ্রান্সের সরকারি সংগ্রহের অংশ হয় এবং শাতো দ্য শঁতিইয়ের Musée Condé-তে সংরক্ষিত থাকে।
চুরির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৬ সালের অক্টোবরে শাতো দ্য শঁতিইয়ে Grand Condé হিরাটি বিশেষ প্রদর্শনীতে দেখানোর কথা রয়েছে। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী।
এই প্রদর্শনীতে শুধু হিরাটিই নয়, এর চুরি, উদ্ধার এবং ঐতিহাসিক যাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে। হিরাটির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়েও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়েছে।
Grand Condé-এর চুরির ঘটনাটি আজও অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত কাহিনিগুলোর একটি। বিপুল নিরাপত্তা পেরিয়ে চোরেরা ঐতিহাসিক হিরা নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজিত করেছিল এমন একটি জিনিস, যার কথা তারা হয়তো কল্পনাও করেনি—একজন ক্ষুধার্ত পরিচারিকা এবং তার খাওয়া একটি আপেল।
প্রায় এক শতাব্দী পরও ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, বড় কোনো অপরাধের রহস্য কখনও কখনও সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত এবং সাধারণ একটি ঘটনার মাধ্যমেই প্রকাশ্যে আসতে পারে।
আরও পড়ুন:







