২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হয় তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২৫ বছর। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে অন্তত ৪৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আল জাজিরা জানিয়েছে, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধগুলোর কারণে প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ৪৫ লাখ। একই সময়ে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির Costs of War প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধাঞ্চলগুলোতে সরাসরি যুদ্ধ-সহিংসতায় প্রায় ৯ লাখ ৬ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের যোদ্ধা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং অন্যান্য ব্যক্তিও রয়েছেন। গবেষণাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক অভিযানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনায় নিয়েছে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু গুলি, বোমা কিংবা বিস্ফোরণে নিহত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের কারণে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোর বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদে আরও বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।
Costs of War-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মৃত্যু মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৬ লাখ।
গবেষকেরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে মৃত্যুর হিসাব করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে প্রকৃত প্রাণহানি প্রকাশিত অনুমানের চেয়েও বেশি হতে পারে।
২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর দুই বছর পর ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আক্রমণ শুরু হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও পাকিস্তানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, ড্রোন হামলা বা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এসব সংঘাতের প্রত্যক্ষ সহিংসতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের অন্যতম বড় মানবিক পরিণতি হলো বাস্তুচ্যুতি। Costs of War-এর হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধগুলোর কারণে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
কেউ দেশের ভেতরে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন, আবার অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী হিসেবে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই যুদ্ধগুলোর আর্থিক মূল্যও ছিল বিপুল। Costs of War প্রকল্পের হিসাবে, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক অভিযান এবং সাবেক সেনাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ৪৫ লাখ মানুষ সবাই মার্কিন সেনাদের সরাসরি হামলায় নিহত হয়েছেন—এমন দাবি গবেষণার ফল নয়।
৪৫ লাখের হিসাবের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ-সহিংসতায় নিহত প্রায় ৯ লাখের পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে রোগ, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন, অবকাঠামো ধ্বংসসহ বিভিন্ন পরোক্ষ কারণে মৃত্যুর আনুমানিক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন:







