News Ticker
221.png

২২ বছর আগে সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকে ৫৪ বছর বয়সে মা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৭

শেয়ার

শেয়ার

২২ বছর আগে সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকে ৫৪ বছর বয়সে মা
ছবি: সংগৃহীত

একদিকে সন্তান হারানোর গভীর শোক, অন্যদিকে নতুন জীবনের আগমন। এমনই আবেগঘন এক ঘটনার সাক্ষী হলো গ্রিস। ৫৪ বছর বয়সে কন্যাসন্তানের মা হয়েছেন ক্রিস্টিনা রাপ্তি-তজেলেপি। আর যে ভ্রূণ থেকে শিশুটির জন্ম, সেটি ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।

গত বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন ক্রিস্টিনা। শিশুটির ওজন ছিল ৩ দশমিক ৪৯ কেজি। মেয়েটির নাম রাখা হয়েছে জর্জিয়া, ক্রিস্টিনার প্রয়াত ছেলে জিওর্গসের স্মরণে।

ক্রিস্টিনা ও তার স্বামী কনস্টান্টিনোস রাপ্তিস ২০০৪ সালে আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ওই সময় তৈরি করা ভ্রূণগুলোর একটি ব্যবহার করে তাদের ছেলে জিওর্গসের জন্ম হয়।

বাকি ভ্রূণগুলোর কয়েকটি ক্রায়োপ্রিজারভেশনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ ২২ বছরেরও বেশি সময় পর সেই একই ব্যাচের একটি ভ্রূণ আবার ব্যবহার করা হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভ্রূণটি ক্রিস্টিনার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর সফল গর্ভধারণের পর চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় জর্জিয়া। 

এই জন্মের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনা।

ক্রিস্টিনা ও কনস্টান্টিনোসের ২১ বছর বয়সী ছেলে জিওর্গস ২০২৫ সালের অক্টোবরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন তারা।

কয়েক মাস পর দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত ভ্রূণগুলোর একটি ব্যবহার করে আবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তাদের নতুন মেয়ের নাম জর্জিয়া রাখা হয়েছে প্রয়াত জিওর্গসের স্মৃতিতে। তবে বাবা-মা স্পষ্ট করেছেন, নতুন সন্তান তাদের হারানো ছেলের বিকল্প নয়। বরং ভয়াবহ শোকের পর এটি তাদের জীবনে নতুন করে আশার আলো এনেছে।

ক্রিস্টিনা বলেন, তারা ‘জীবনকে দ্বিতীয় সুযোগ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং পরিবারের গল্পকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।

এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ক্রিস্টিনার বয়স।

গ্রিসে নারীদের আইভিএফ চিকিৎসার জন্য আইনগত বয়সসীমা ৫৪ বছর। ফলে ক্রিস্টিনার হাতে চিকিৎসা সম্পন্ন করার জন্য খুব অল্প সময় ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তার হাতে ছিল মাত্র আড়াই মাসের মতো সময়। প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া থেকে শুরু করে ভ্রূণ প্রতিস্থাপন—সবকিছু দ্রুত করতে হয়েছে। 

ক্রিস্টিনা বলেন, প্রক্রিয়াটি মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপের ছিল। তবে চিকিৎসক ও পুরো মেডিকেল টিমের সহায়তায় তারা সব বাধা অতিক্রম করেন।

আইভিএফ চিকিৎসায় অতিরিক্ত ভ্রূণ সংরক্ষণের জন্য ক্রায়োপ্রিজারভেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

এতে ভ্রূণকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়, ফলে তার কোষীয় কার্যক্রম কার্যত স্থগিত থাকে। তাই সাধারণ মানুষের মতো সংরক্ষিত অবস্থায় ভ্রূণের বয়স বাড়ে না।

অর্থাৎ, ২০০৪ সালে তৈরি ভ্রূণটি ২২ বছর ধরে কোনো শিশুর মতো বেড়ে ওঠেনি। বরং তার জৈবিক বিকাশ সংরক্ষণের সময় প্রায় স্থির ছিল। পরে সেটি গর্ভধারণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

২২ বছরের বেশি সময় সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকে সফল গর্ভধারণ ও জন্ম নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। তবে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকে জন্ম বলা যাবে না।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে ৩০ বছরেরও বেশি সময় সংরক্ষিত একটি ভ্রূণ থেকে শিশুর জন্ম হয়েছিল। সেটি ছিল ‘embryo adoption’-এর মাধ্যমে—অর্থাৎ ভ্রূণটির জেনেটিক বাবা-মায়ের পরিবর্তে অন্য এক দম্পতি সেটি গ্রহণ করেছিলেন। ওই ঘটনাটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও স্বীকৃতি পেয়েছিল। 

গ্রিসের ঘটনাটির বিশেষত্ব হলো, এখানে ব্যবহৃত ভ্রূণটি ক্রিস্টিনার নিজের আগের আইভিএফ চিকিৎসার সময় তৈরি হয়েছিল।

ঘটনাটি বুঝতে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রূণটি ২২ বছর ধরে সংরক্ষিত থাকলেও ক্রিস্টিনার বয়স ২২ বছর বেড়েছে।

ক্রায়োপ্রিজারভেশনের মাধ্যমে ভ্রূণের বিকাশ স্থগিত রাখা সম্ভব হলেও মায়ের শরীরের বয়স স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তাই বেশি বয়সে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মায়ের জন্য কিছু অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়।

এই কারণেই এমন চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু ভ্রূণের বয়স নয়, গর্ভধারণকারী নারীর বয়স ও শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনার পর গ্রিসে আইভিএফের বয়সসীমা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ক্রিস্টিনার চিকিৎসক ড. কস্তাস পান্তোস, যিনি হেলেনিক সোসাইটি অব রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের প্রধান, বলেছেন দেশটির কঠোর বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে গ্রিসে জন্মহার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখছেন।

সূত্র: এপি নিউজ 

ChannelNRB Footer