শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাইছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনকে পাঠানো এক চিঠিতে ম্যাক্রোঁ বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইউরোপজুড়ে একটি অভিন্ন নীতি প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাব হলো—১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
তবে বিষয়টি এখনো ফ্রান্সে কার্যকর কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা নয়। বরং দেশটির জাতীয় পর্যায়ের আইনটি ইতোমধ্যে সাংবিধানিক বাধার মুখে পড়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ফরাসি পার্লামেন্ট ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল অনুমোদন করে। এর ফলে ফ্রান্স ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে এমন কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণের পথে এগিয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ চেয়েছিলেন নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকেই এই বিধিনিষেধ কার্যকর হোক।
কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার আগেই ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ সেটিতে আপত্তি জানায়। আগস্টের রায়ে পরিষদ বলেছে, প্রস্তাবিত বিধান নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতার ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা নেই বলেও আপত্তি জানানো হয়।
ফলে ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার আইনটি সরাসরি কার্যকর হয়নি।
জাতীয় পর্যায়ে বাধার মুখে পড়ার পর ম্যাক্রোঁ এখন বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছেন।
তাঁর যুক্তি, একটি দেশের আলাদা আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিয়ম আলাদা হলে শিশুদের বয়স যাচাই এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর করাও জটিল হয়ে পড়বে।
এ কারণে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি অভিন্ন আইন তৈরির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। ম্যাক্রোঁ মনে করেন, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ থাকলে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম, মনোযোগ এবং অনলাইন নিরাপত্তার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে অ্যালগরিদম-নির্ভর কনটেন্ট, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর বা বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট এবং অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম নিয়ে অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ফ্রান্সের উদ্যোগও এই বৃহত্তর উদ্বেগের অংশ। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতা বাড়ানোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ফ্রান্সের উদ্যোগের পেছনে অস্ট্রেলিয়ার পদক্ষেপও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের অন্যতম কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে।
ফ্রান্সের প্রস্তাবিত সীমা ১৫ বছর। ম্যাক্রোঁর উদ্যোগ সফল হলে ইউরোপেও শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে প্রস্তাবটি নিয়ে ইউরোপে সবাই একমত নয়। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত।
অন্যদিকে শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অনেকেই মনে করেন, শুধু অভিভাবকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে অনলাইন ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া বয়স যাচাই কীভাবে করা হবে—এটিও বড় প্রশ্ন। প্রত্যেক ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে তা আবার গোপনীয়তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদের আপত্তির অন্যতম কারণও ছিল এই ধরনের আইনি ও গোপনীয়তা-সংক্রান্ত বিষয়।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







