একসময় যে জমিকে প্রায় অনুর্বর ও প্রাণহীন বলে মনে করা হতো, সেখানে ফেলা হয়েছিল হাজার হাজার টন কমলার খোসা ও পাল্প। উদ্দেশ্য ছিল মূলত জুস তৈরির পর তৈরি হওয়া বিপুল বর্জ্য ফেলার একটি জায়গা খুঁজে বের করা। কিন্তু ১৬ বছর পর সেখানে গিয়ে বিজ্ঞানীরা যে দৃশ্য দেখলেন, তা তাদের বিস্মিত করে দেয়—অনুর্বর জমিটি পরিণত হয়েছে ঘন সবুজ বনভূমিতে।
ঘটনাটি ঘটেছিল মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকায়। ১৯৯৭ সালে পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জ্যানজেন ও উইনি হলওয়াক্স জুস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Del Oro-এর সঙ্গে একটি ব্যতিক্রমী পরিবেশগত উদ্যোগ নেন। প্রতিষ্ঠানটি যদি সংরক্ষণ এলাকার জন্য জমি দান করে, তাহলে কাছের একটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অনুর্বর জমিতে তাদের কমলার বর্জ্য ফেলার সুযোগ দেওয়া হবে—এমন একটি সমঝোতা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় এক হাজার ট্রাকে করে ওই এলাকায় নেওয়া হয় ১২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি কমলার খোসা ও জুস তৈরির পর অবশিষ্ট পাল্প। এসব বর্জ্য প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন জায়গাটি ছিল অতিরিক্ত চারণ ও বন উজাড়ের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি জমি।
প্রথম দিকে অবশ্য পরিস্থিতি মোটেও সুখকর ছিল না। বিপুল পরিমাণ কমলার বর্জ্য পচতে শুরু করলে সেটি কালচে, আঠালো ও দুর্গন্ধযুক্ত স্তরে পরিণত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জৈব বর্জ্য মাটির সঙ্গে মিশে যেতে থাকে।
প্রায় ১৬ বছর পর, ২০১৩ সালে গবেষক টিমোথি ট্রুয়ার ওই জায়গাটি খুঁজতে সেখানে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষার স্থানটি পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু তিনি গিয়ে পুরোনো সেই জমিটি খুঁজেই পাচ্ছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, যে জায়গাটিকে একসময় অনুর্বর জমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেটিই ঘন গাছপালায় ঢেকে গেছে। এমনকি জায়গাটি শনাক্ত করার জন্য লাগানো বড় হলুদ সাইনবোর্ডটিও গাছপালার আড়ালে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল।
ট্রুয়ারের গবেষণায় দেখা যায়, পাশের তুলনামূলক অনুর্বর জমির সঙ্গে পরীক্ষামূলক এলাকার পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। কমলার বর্জ্য ফেলা এলাকায় গাছপালার বৈচিত্র্যও অনেক বেশি ছিল।
পরে গবেষকরা পরীক্ষামূলক এলাকা এবং পাশের নিয়ন্ত্রণ এলাকার মধ্যে তুলনা করেন। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। কমলার বর্জ্য ফেলা জমিতে গাছের ওপরিভাগের বায়োমাস ১৭৬ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। সেখানে প্রায় দুই ডজন প্রজাতির উদ্ভিদও শনাক্ত করা হয়, যেখানে পাশের এলাকায় উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ছিল অনেক কম।
গবেষকদের ধারণা, পচে যাওয়া কমলার খোসা ও পাল্প মাটিতে বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থ ও পুষ্টি যোগ করেছিল। একই সঙ্গে পুরু জৈব স্তরটি অনুপ্রবেশকারী ঘাসের বিস্তার কমিয়ে দিতে পারে, ফলে নতুন গাছপালা বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।
এই ঘটনা পরিবেশবিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ এটি দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে খাদ্যশিল্পের জৈব বর্জ্য ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকরা অবশ্য এটিকে যত্রতত্র খাদ্যবর্জ্য ফেলার অনুমতি হিসেবে দেখেন না। পরিবেশ, মাটি, পানির উৎস ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণাটি বরং দেখিয়েছে, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও পরিবেশগত তদারকির মাধ্যমে কৃষি ও খাদ্যশিল্পের বর্জ্যকে ভূমি পুনরুদ্ধারে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরীক্ষার পথও পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বী একটি জুস কোম্পানি প্রকল্পটির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ তোলে। পরে বিষয়টি কোস্টারিকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং পরীক্ষাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় জায়গাটি প্রায় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
কিন্তু প্রকৃতিই যেন সেই জায়গায় নিজের মতো করে পরীক্ষা চালিয়ে যায়। বহু বছর পর গবেষকরা যখন ফিরে যান, তখন সেখানে অনুর্বর জমির বদলে দেখতে পান একটি সমৃদ্ধ, ঘন সবুজ পরিবেশ।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য তৈরি হয়। এর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ল্যান্ডফিল বা আবর্জনার স্তূপে যায়। কোস্টারিকার এই ঘটনা তাই গবেষকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে—সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বর্জ্যের কিছু অংশ কি ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করা সম্ভব?
গবেষকদের মতে, এর উত্তর সব জায়গায় একই হবে না। ভিন্ন পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। তবে কোস্টারিকার এই পরীক্ষাটি দেখিয়েছে, কখনো কখনো মানুষের চোখে মূল্যহীন বর্জ্যও প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন:







