News Ticker
221.png

কেমোথেরাপি নেওয়ার ১১ বছর পর জানা গেল ক্যানসারই ছিল না

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:২৬

শেয়ার

শেয়ার

কেমোথেরাপি নেওয়ার ১১ বছর পর জানা গেল ক্যানসারই ছিল না
ছবি: সংগৃহীত

২১ বছর বয়সে চিকিৎসকের কাছ থেকে শুনেছিলেন, তাঁর মস্তিষ্কে মরণব্যাধি ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। বাঁচার জন্য শুরু হয়েছিল কেমোথেরাপি। কিন্তু এক-দুই বছর নয়, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে চলেছে সেই চিকিৎসা। এত বছর পর জানা গেল—তাঁর আদৌ মস্তিষ্কে ক্যানসার ছিল না।

অবিশ্বাস্য এই ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাজ্যের কোভেন্ট্রির বাসিন্দা বেকি জোন্সের সঙ্গে। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এই দুই সন্তানের মা দাবি করছেন, ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার মধ্যে কেটে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ও আরও ৪০ জনের বেশি রোগী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। 

২০১২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে বেকি জোন্স তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যায় চিকিৎসকের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁকে জানানো হয়, তাঁর মস্তিষ্কে গুরুতর টিউমার রয়েছে এবং এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কোভেন্ট্রির ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে কর্মরত তৎকালীন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউন তাঁকে গ্রেড-৪ গ্লিওব্লাস্টোমা—মস্তিষ্কের অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ধরনের ক্যানসার—হিসেবে শনাক্ত করেন। এমনকি বেকিকে বলা হয়েছিল, চিকিৎসা না নিলে তাঁর হাতে হয়তো খুব বেশি সময় নেই।

এরপর তাঁকে টেমোজোলোমাইড (Temozolomide) নামের কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া শুরু হয়।

বেকির দাবি, তাঁকে বলা হয়েছিল দীর্ঘদিন, এমনকি সারা জীবনও এই ওষুধ নিতে হতে পারে। অথচ প্রচলিত চিকিৎসা নির্দেশিকায় এ ধরনের চিকিৎসা সাধারণত সীমিত সংখ্যক সাইকেলের মধ্যে রাখার কথা।

বেকি বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, বিভিন্ন স্ক্যানে কেন মস্তিষ্কে স্পষ্ট কোনো টিউমার দেখা যাচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল টিউমারটি খালি চোখে দেখা যাবে না। ফলে তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যান।

দীর্ঘ ১১ বছরের চিকিৎসা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে বলে জানিয়েছেন বেকি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত বমিভাব, পেটব্যথা, মুখে ঘা এবং প্রচণ্ড ক্লান্তির মতো সমস্যায় ভুগতেন তিনি। সংক্রমণের আশঙ্কায় সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক আয়োজন এড়িয়ে চলতে হতো। জিমে যাওয়া, সঙ্গীর সঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া—এসবও বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসার কারণে তাঁর গাড়ি চালানোর অনুমতিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এমনকি তাঁকে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে তাঁর সন্তান নেওয়ার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরে অবশ্য বেকি দুই সন্তানের মা হন।

এক দশকেরও বেশি সময় চিকিৎসা চলার পর ২০২৪ সালে হঠাৎ তাঁকে জানানো হয়, কেমোথেরাপি বন্ধ করা হবে। কিন্তু কেন চিকিৎসা বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাননি বলে দাবি করেছেন।

তাঁকে শুধু জানানো হয়েছিল, তাঁর চিকিৎসক ইয়ান ব্রাউন অবসর নিয়েছেন। এরপর বেকির মনে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়—যদি চিকিৎসা এতদিন জরুরি হয়ে থাকে, তাহলে হঠাৎ তা বন্ধ করা হলো কেন?

এরপর আইনজীবীদের উদ্যোগে নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের দিয়ে তাঁর পুরোনো চিকিৎসা নথি ও স্ক্যান স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করানো হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে বেকিকে জানানো হয়, তাঁর কখনোই মস্তিষ্কে ক্যানসার ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা অনুযায়ী, তাঁর প্রকৃত সমস্যা ছিল tumefactive demyelination—মস্তিষ্কে এমন এক ধরনের প্রদাহজনিত অবস্থা, যা টিউমারের মতো দেখতে হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সমস্যার চিকিৎসায় কেমোথেরাপির বদলে স্টেরয়েডসহ নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসা ব্যবহার করা যেতে পারে। 

বেকির কাছে খবরটি ছিল একই সঙ্গে স্বস্তি ও ধাক্কার। তিনি বলেন, এত বছর তিনি যে রোগের সঙ্গে লড়াই করেছেন, সেটিই তাঁর ছিল না।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর একই হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে আরও রোগীর অভিযোগ সামনে এসেছে। ৪০ জনের বেশি রোগী দীর্ঘমেয়াদি বা অপ্রয়োজনীয় ক্যানসার চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কোভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার NHS ট্রাস্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। 

যুক্তরাজ্যের Royal College of Physicians (RCP)-এর একটি পর্যালোচনায় ২০টি কেস পরীক্ষা করে ১৫টিকে সামগ্রিকভাবে ‘unsatisfactory’ বা অসন্তোষজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যালোচনায় দীর্ঘ সময় টেমোজোলোমাইড ব্যবহারের ক্ষেত্রে উপকারের প্রমাণ খুবই কম বা অনুপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরামর্শ ও রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি নতুন করে যাচাই করার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।

ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কোভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার NHS ট্রাস্ট জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট রোগীদের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, কেমোথেরাপির ওষুধ টেমোজোলোমাইডের ব্যবহার ও প্রেসক্রিপশনের ওপর আরও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে তারা। 

বেকি জোন্সের কাছে এই ঘটনা শুধু একটি ভুল রোগ নির্ণয়ের ঘটনা নয়; তাঁর দাবি, এর প্রভাব তাঁর পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের ওপর পড়েছে।

১১ বছর ধরে ক্যানসারের ভয়, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে থাকার পর জানতে পারলেন—যে ক্যানসারের বিরুদ্ধে তিনি লড়ছিলেন, সেটিই তাঁর ছিল না।

ChannelNRB Footer