পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রতলে স্বর্ণ ও রূপায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি নতুন খনিজ ভান্ডারের সন্ধান পেয়েছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক সমুদ্রবৈজ্ঞানিক অভিযানে এই খনিজ ক্ষেত্র শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভান্ডারটির কিছু আকরিক নমুনায় স্বর্ণ ও রূপার ঘনত্ব স্থলভাগের অনেক সাধারণ খনিজ সম্পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির বরাত দিয়ে দক্ষিণ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, চীনের কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই অনুসন্ধান পরিচালনা করে। অভিযানটি চালানো হয় চীনের গবেষণা জাহাজ ‘সিয়াংইয়াংহং-১০’ থেকে। আগস্টে শুরু হওয়া ১৮ দিনের এই অভিযানে গভীর সমুদ্রে সাতটি ডুব পরিচালনা করা হয়।
গবেষকরা স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান এবং বিশেষভাবে তৈরি গভীর সমুদ্রের নমুনা সংগ্রহকারী যন্ত্র ব্যবহার করে সমুদ্রতলের খনিজ অঞ্চল পরীক্ষা করেন। প্রায় ৭০০ থেকে ১,৫০০ মিটার গভীরতায় ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি উচ্চতাপমাত্রার হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা সমুদ্রতলের উত্তপ্ত জলপ্রবাহের উপস্থিতি আগে থেকেই শনাক্ত হয়েছিল। এসব ভেন্টের আশপাশেই মূল্যবান ধাতুসমৃদ্ধ আকরিক জমা হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের নিচে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় উত্তপ্ত ও খনিজসমৃদ্ধ পানি ভূত্বকের ফাটল দিয়ে ওপরে উঠে আসে। ঠান্ডা সমুদ্রের পানির সংস্পর্শে এসে ওই দ্রবণে থাকা বিভিন্ন ধাতু জমাট বাঁধে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে সোনা, রূপা, তামা ও অন্যান্য ধাতুসমৃদ্ধ সালফাইড আকরিকের স্তর তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যই আবিষ্কারটিকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে। কিছু নমুনায় প্রতি টন আকরিকে সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৪ গ্রাম স্বর্ণ এবং প্রায় ১ হাজার ২৭১ গ্রাম পর্যন্ত রূপা পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা পুরো খনিজ ক্ষেত্রের গড় ধাতব ঘনত্ব নয়; এটি পরীক্ষিত কিছু নমুনায় পাওয়া সর্বোচ্চ মাত্রার তথ্য।
চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওশান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিজ্ঞানী সং শিজি জানিয়েছেন, ওই বৃহৎ সমুদ্রতল খনিজ অঞ্চলের অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর প্রকৃত আয়তন, মোট ধাতব মজুত এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন সম্ভব কি না—এসব নির্ধারণে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা এখনো পুরো ভান্ডারে মোট কত টন স্বর্ণ রয়েছে, তা নির্ধারণ করেননি। একইভাবে এই সম্পদ উত্তোলনের খরচ, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং পরিবেশগত প্রভাবও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
চীনের এই আবিষ্কার এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বিশ্বজুড়ে গভীর সমুদ্রের তলদেশে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। স্বর্ণ, রূপা, তামা, নিকেলসহ বিভিন্ন ধাতুসমৃদ্ধ সামুদ্রিক খনিজ ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। সমুদ্রতল থেকে খনিজ উত্তোলনের ফলে সেখানে থাকা অনন্য জীবপ্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে বলে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে আসছেন।
চীনের জন্য এই আবিষ্কার শুধু সম্ভাব্য স্বর্ণ-রূপার উৎস হিসেবেই নয়, গভীর সমুদ্র গবেষণা ও খনিজ অনুসন্ধানে দেশটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান, গভীর সমুদ্রের নমুনা সংগ্রহ প্রযুক্তি এবং সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের উন্নতি ভবিষ্যতে আরও নতুন খনিজ ক্ষেত্র শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
আরও পড়ুন:







