সৌদি আরবের আল-বাহা অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, স্থাপনাটি হিজরি প্রথম শতকের সময়ের। অর্থাৎ ইসলামের প্রাথমিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
আল-বাহা অঞ্চলের আল-আকিকের কাছে আল-মা'মালা প্রত্নস্থলে সৌদি হেরিটেজ কমিশনের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন অভিযানের চতুর্থ মৌসুমে মসজিদটির সন্ধান মেলে। গবেষকদের মতে, স্থাপনাটি সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের শুরুর দিকের সময়কালের হতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মসজিদটি শক্তভাবে কাটা গ্রানাইট পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬ মিটার এবং প্রস্থ পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০ মিটার।
মসজিদের ভেতরে নামাজের দিক নির্দেশকারী মিহরাব পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে তিনটি প্রবেশপথের চিহ্ন রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব অংশে একটি বর্গাকার কাঠামো পাওয়া গেছে, যেটিকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মিনারের অংশ বলে মনে করছেন।
মসজিদের সঙ্গে যুক্ত আরও আটটি কক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব কক্ষ এবং আশপাশের স্থাপনা থেকে বোঝা যায়, মসজিদটি একটি সক্রিয় বসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল।
এই আবিষ্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মসজিদটির দেয়াল ও পাথরে পাওয়া প্রাচীন আরবি শিলালিপি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শিলালিপির মধ্যে ধর্মীয় প্রার্থনা ও কোরআনের বিষয়বস্তু রয়েছে।
মসজিদের কিবলা দেয়ালে পাওয়া একটি শিলালিপিতে মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ-এর প্রতি দোয়া বা আশীর্বাদ প্রার্থনার উল্লেখ রয়েছে বলে গবেষণায় জানানো হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এ ধরনের শিলালিপি শুধু স্থাপত্যের অলংকার নয়; বরং ওই সময়ের ধর্মীয় জীবন ও লিখিত সংস্কৃতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
আল-মা'মালা এলাকাটি কেবল ধর্মীয় স্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সেখানে খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এলাকাটিতে স্বর্ণ, রুপা ও তামা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কর্মকাণ্ড চলত। বসতবাড়ি, কারুশিল্পের নিদর্শন, বিভিন্ন সরঞ্জাম, মৃৎপাত্র এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীও সেখানে পাওয়া গেছে। এসব তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আল-মা'মালা ছিল খনি, বসতি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ।
প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় খনন কার্যক্রম ইসলামের আবির্ভাবের আগেও শুরু হয়েছিল এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শতকের মধ্যে তা বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। ফলে আবিষ্কৃত মসজিদটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ওই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আল-মা'মালা আল-আকিক থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পূর্বে এবং আল-বাহা থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এলাকাটি প্রাচীন দারব আল-ফিল বা ‘এলিফ্যান্ট রোড’-এর কাছাকাছি ছিল। ঐতিহাসিকভাবে এই পথ দক্ষিণ আরবের সঙ্গে উত্তরের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগে ব্যবহৃত হতো এবং পরবর্তী সময়ে ভ্রমণকারী ও তীর্থযাত্রীদের চলাচলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে আবিষ্কৃত মসজিদটির গুরুত্ব শুধু এর বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। মসজিদের স্থাপত্য, মিহরাব, প্রবেশপথ, সংলগ্ন কক্ষ এবং প্রাচীন আরবি শিলালিপি—সবকিছু মিলিয়ে ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরব উপদ্বীপের একটি সক্রিয় জনপদে ধর্মীয় জীবন কেমন ছিল, সে বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি হেরিটেজ কমিশনের প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতের খনন ও গবেষণায় মসজিদটির নির্মাণকাল, কতদিন এটি ব্যবহৃত হয়েছিল এবং আল-মা'মালা জনপদের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন:







