যুদ্ধাপরাধের দায়ে কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স। ১৯৯৮-৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ এবং বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী আটকসংক্রান্ত চারটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
৫৮ বছর বয়সী থাচি কসোভো লিবারেশন আর্মি (কেএলএ)-এর শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের একজন ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি কসোভোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার সময় তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং পরে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন।
আদালতের রায়ে থাচিকে কেএলএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আটককেন্দ্রে মানুষকে বেআইনিভাবে আটক, নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ এবং হত্যার ঘটনায় অপরাধমূলকভাবে দায়ী করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের মামলায় বলা হয়েছিল, কেএলএর বিরোধী বা সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করা বেসামরিক ব্যক্তি ও যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি অংশ না নেওয়া মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত ৯৬ জন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সহযোগী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় থাচিকে দায়ী করেছে। একই মামলায় ৩৮৫ জনকে বেআইনিভাবে আটক এবং ৩০৩ জনকে নির্যাতনের ঘটনাও আদালতের বিবেচনায় এসেছে।
তবে আদালত তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেনি। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় ছয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
থাচির সঙ্গে একই মামলায় কসোভো লিবারেশন আর্মির আরও তিন সাবেক শীর্ষ নেতাকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
-
হাশিম থাচি — ২৫ বছর কারাদণ্ড
-
জাকুপ ক্রাসনিকি — ২৫ বছর কারাদণ্ড
-
কাদরি ভেসেলি — ১৮ বছর কারাদণ্ড
-
রেক্সহেপ সেলিমি — ১৩ বছর কারাদণ্ড
হাশিম থাচি ও অন্য তিন আসামির বিচার শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের পর্ব শেষ হয় এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মামলায় মোট ১৩৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স জানিয়েছে, মামলায় যুদ্ধের সময় কসোভো এবং উত্তর আলবেনিয়ার কুকেস ও কাহান অঞ্চলে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ বিবেচনা করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের মার্চ থেকে ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার মোকাবিলার জন্য ২০২০ সালে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন থাচি। একই বছর নভেম্বর মাসে তাকে গ্রেপ্তার করে দ্য হেগে কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্সের হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি আদালতের হেফাজতেই ছিলেন।
বিচার চলাকালে থাচি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন। তার পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, কেএলএর কাঠামো এমন ছিল না যে শীর্ষ নেতারা মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন বা তাদের সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী করা যায়।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কসোভোর রাজধানী প্রিশতিনায় থাচির সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রায় ঘোষণার আগে তার সমর্থনে বড় সমাবেশও হয়েছিল। কসোভোর অনেক মানুষের কাছে থাচি এখনও সার্বিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, এই দণ্ড যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিখোঁজদের পরিবারের জন্য জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
রায়ের বিরুদ্ধে থাচির পক্ষ থেকে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আপিল আদালত রায়ের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে পারে। একই সঙ্গে থাচির বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা বা সাক্ষীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হস্তক্ষেপের অভিযোগে একটি পৃথক মামলাও চলছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







