News Ticker
221.png

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে এআইকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:১৩

শেয়ার

শেয়ার

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে এআইকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল
ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের মধ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমি ও স্থাপনা পর্যবেক্ষণ এবং বাড়িঘর ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় এআই-চালিত প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি উঠেছে। একই সময়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘NAZA’ নামের একটি তথ্যচিত্র। 

আল জাজিরার ১৭ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জমিতে পরিবর্তন শনাক্ত করতে এআই-সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং এর মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ ও উচ্ছেদ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে Rafael-এর ‘ImiSight’ প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভূমির ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম।

এআই ব্যবহারের মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—প্রযুক্তি কীভাবে সামরিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। স্যাটেলাইট বা আকাশপথের ছবি, ভূমির তথ্য এবং অন্যান্য নজরদারি উপাত্ত দ্রুত বিশ্লেষণ করে কোনো স্থানে নতুন স্থাপনা বা পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি যদি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস বা উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হয়, তাহলে আগে যে প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে যাচাই প্রয়োজন হতো, তা অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে। 

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দপ্তর OCHA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১,১৯১টি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং এর ফলে ১,৫৫৭ জন ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন—ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী। এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে এআই ব্যবহারের সরাসরি কারণ-সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি; বরং এটি পশ্চিম তীরে চলমান উচ্ছেদ ও ধ্বংসের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি চিত্র দেয়। 

গাজা যুদ্ধেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এআই ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। ‘The Gospel’ এবং ‘Lavender’ নামে পরিচিত প্রযুক্তি নিয়ে ২০২৪ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, The Gospel বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ভবন বা স্থাপনাকে লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে Lavender মানুষের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ধরনের ব্যবস্থার সমালোচকরা বলছেন, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য লক্ষ্য দ্রুত শনাক্ত করা হলে ভুল শনাক্তকরণ এবং বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, এ ধরনের প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয় এবং লক্ষ্য নির্বাচন ও হামলার অনুমোদনে মানবীয় সিদ্ধান্ত থাকে। 

এআই-নির্ভর যুদ্ধের বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর নির্মিত তথ্যচিত্র ‘NAZA’ ঘিরে।

২০২৬ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রটিতে ২৪ জন ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার বেনামি সাক্ষ্য ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, গাজায় লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও হামলার পরিকল্পনায় এআই-সহায়ক ব্যবস্থার ব্যবহার সামরিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

তথ্যচিত্রের সাক্ষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে সামরিক কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন। ছবিটি আরও দাবি করে, প্রত্যাশিত বেসামরিক হতাহতের হিসাবও কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হতো।

তবে এসব অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেনামি সূত্রের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তথ্যচিত্রটির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এসব সূত্রের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় না এবং গাজায় লক্ষ্য নির্বাচন ও হামলার অনুমোদন মানুষের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই হয়। 

এআই বিতর্কের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের OCHA-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত শত শত স্থাপনা ধ্বংস এবং সহস্রাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ভূমি দখলের ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর বাস্তুচ্যুতির চাপ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

এদিকে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের E1 settlement plan-এ আরও ২,১৬৭টি আবাসন ইউনিটের জন্য টেন্ডার যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করেছে; ইসরায়েলি কর্মকর্তারা পরিকল্পনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। 

ফিলিস্তিনে এআই ব্যবহারের বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল নয়। নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অ্যালগরিদমের ভূমিকা বাড়ছে।

ফলে মূল প্রশ্ন শুধু “এআই ব্যবহার করা হয়েছে কি না”—এতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে, এআই কী ধরনের তথ্য ব্যবহার করছে, তার সিদ্ধান্ত কতটা নির্ভুল, মানুষ কতটা যাচাই করছে এবং প্রযুক্তির সিদ্ধান্তে বেসামরিক ক্ষতি হলে দায় কে নেবে।

গাজা ও পশ্চিম তীরের ঘটনাগুলো তাই যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। অভিযোগগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে নতুন প্রতিবেদন ও ‘NAZA’ তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

ChannelNRB Footer