স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর প্রবণতা কমাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর। নাগরিকদের বই পড়ায় উৎসাহিত করতে দেশটিতে চালু হয়েছে ReadSG নামের একটি জাতীয় কর্মসূচি। এই উদ্যোগে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট বই বা অন্যান্য উপযোগী লেখা পড়ার জন্য অংশগ্রহণকারীদের ভার্চুয়াল কয়েন দেওয়া হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছালে নগদ অর্থে রূপান্তর করা যাবে।
ReadSG কর্মসূচির নিয়ম বেশ সহজ। একজন অংশগ্রহণকারী প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট পড়লে ২০টি ভার্চুয়াল কয়েন পাবেন। এক দিনে সর্বোচ্চ একটি রিডিং সেশনই পুরস্কারের জন্য গণনা করা হবে।
এভাবে ১,০০০ কয়েন জমাতে পারলে পাওয়া যাবে ১ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে পড়লে প্রায় ৫০টি সেশন শেষে ১ ডলার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক বছর নিয়মিত পড়লেও আর্থিক পুরস্কারের পরিমাণ খুব বেশি নয়—প্রায় ৭ দশমিক ৩০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার।
উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য অবশ্য অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি করা নয়। বরং ছোট আর্থিক পুরস্কার ও গেমের মতো পয়েন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করা।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ড—NLB—বলছে, বর্তমানে মানুষ দ্রুত পড়া যায় এমন ছোট ছোট অনলাইন কনটেন্ট, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রেখে পড়া এবং তথ্য বিশ্লেষণের অভ্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
NLB-এর প্রধান মেলিসা ট্যামের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে বড় লক্ষ্য নির্ধারণের পরিবর্তে প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট দিয়ে শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটির লক্ষ্য হলো মানুষের মনোযোগ, কল্পনাশক্তি ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বাড়ানো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটির পর একটি পোস্ট, ভিডিও বা খবর অনবরত স্ক্রল করার অভ্যাসকে অনেক সময় ‘doomscrolling’ বলা হয়। এই প্রবণতা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর সরকার ইতোমধ্যে শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির Ministry of Digital Development and Information ‘Screen Smart from the Start’ নামে একটি জাতীয় কর্মসূচি চালু করে। এতে পরিবারগুলোকে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্ক্রিনের বাইরে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বই পড়াকেও গুরুত্বপূর্ণ অফলাইন কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ReadSG-এর ক্ষেত্রে লক্ষ্য শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক বই শেষ করা নয়। প্রতিদিন কিছু সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই কর্মসূচিটির কেন্দ্রীয় বিষয়।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশ সপ্তাহে অন্তত একবার কিছু না কিছু পড়লেও বই পড়ার হার তুলনামূলকভাবে কম। তাই দীর্ঘ ও মনোযোগী পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, পড়ার সক্ষমতার দিক থেকে সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত ভালো অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের PISA মূল্যায়নে দেশটির ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা রিডিং পারফরম্যান্সে শীর্ষে ছিল। তারপরও তরুণদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ধরন এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অর্থাৎ উদ্যোগটি মূলত সাক্ষরতার ঘাটতি পূরণের চেয়ে পড়ার অভ্যাস ও গভীর মনোযোগ ধরে রাখার সংস্কৃতি জোরদার করার চেষ্টা।
ReadSG-তে দেওয়া অর্থের পরিমাণ এত কম যে এটিকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি একটি behavioural incentive—অর্থাৎ কোনো ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুলতে ছোট পুরস্কার দেওয়ার কৌশল।
সিঙ্গাপুর সরকার এর আগেও নাগরিকদের স্বাস্থ্যকর আচরণে উৎসাহ দিতে আর্থিক পুরস্কার ও ভাউচারভিত্তিক কর্মসূচি ব্যবহার করেছে। ReadSG-তেও একই ধরনের ‘গেমিফিকেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ReadSG-কে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের পড়ার সময় লগ করার মাধ্যমে নিজেদের অগ্রগতি অনুসরণ করার সুযোগ থাকছে। একই সময়ে NLB-এর Read for Good নামের দাতব্য পাঠ কর্মসূচির সঙ্গেও এটি যুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালে ৭৫ লাখ মিনিট পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন:







