১০ বছর ধরে পার্কিনসন্স রোগের কারণে কাঁপছিল হাত। গ্লাস হাতে নিলেও তা স্থির রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার চলার সময়ই হঠাৎ থেমে গেল সেই দীর্ঘদিনের কাঁপুনি। অস্ত্রোপচারের মাঝেই নিজের হাতে গ্লাস ধরে তা স্থির রাখলেন রোগী।
অভূতপূর্ব এই ঘটনা ঘটেছে মিশরে। সৌদি নাগরিক আহমেদ আল-জাহরানির মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন মিশরের নিউরোসার্জন ড. আলী সালাহ। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে পুরোপুরি অচেতন করা হয়নি; স্থানীয় অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে তাকে জাগ্রত রাখা হয়। ফলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন পর্যায়ে রোগীর প্রতিক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
চিকিৎসক ড. আলী সালাহ অস্ত্রোপচারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ভিডিওর শুরুতে দেখা যায়, আহমেদ একটি পানির গ্লাস ধরে আছেন এবং তার হাত স্পষ্টভাবে কাঁপছে।
এরপর চিকিৎসা প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের কম্পন কমতে থাকে। একপর্যায়ে কাঁপুনি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন রোগী কোনো পানি না ফেলেই গ্লাসটি স্থিরভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হন।
চিকিৎসক সালাহ জানান, দীর্ঘ ১০ বছরের ভোগান্তির পর অস্ত্রোপচারের এই পর্যায়েই রোগীর কম্পন বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের চিকিৎসার ফল রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং অস্ত্রোপচারের উপযোগিতা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের পর নির্ধারণ করা হয়।
এ ধরনের কিছু মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে রোগীকে জাগ্রত রাখা হয়, যাতে চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে কাজ করার সময় রোগীর নড়াচড়া ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। বিশেষ করে পার্কিনসন্স ও অন্যান্য মুভমেন্ট ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করার সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আহমেদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সময় তার সঙ্গে কথা বলেন এবং তার হাতের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করেন। এতে চিকিৎসার লক্ষ্যবস্তুতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পর কম্পনের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা সম্ভব হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের আগে আহমেদের সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করা হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়।
চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের থ্যালামাসের অত্যন্ত ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করেন। বিশেষ নেভিগেশন ব্যবস্থার সাহায্যে নিরাপদ পথ নির্ধারণ করে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি যন্ত্র নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো হয়। এরপর তাপশক্তি প্রয়োগ করে লক্ষ করা অংশের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
পার্কিনসন্স একটি প্রগতিশীল স্নায়বিক রোগ। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে হাত-পা কাঁপা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরার গতি ধীর হয়ে যাওয়া রয়েছে।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ দিয়ে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বা কম্পনসহ উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে তখন বিশেষায়িত সার্জারি বিবেচনা করা হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের সময় হাতের কম্পন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি তাৎক্ষণিক ফলাফলের একটি উদাহরণ হলেও, এটিকে সব পার্কিনসন্স রোগীর জন্য একই ধরনের ফলের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ড. আলী সালাহও জানিয়েছেন, রোগীভেদে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। তাই এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার আগে রোগীর অবস্থা, রোগের ধরন, আগের চিকিৎসার ফল এবং অস্ত্রোপচারের উপযোগিতা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:







