জাপান সাগর, যাকে দুই কোরিয়া ‘পূর্ব সাগর’ বলে, অভিমুখে ফের দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। রোববার দেশটির পূর্ব উপকূলীয় ওয়নসান এলাকা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি উৎক্ষেপণ করা হয় বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (JCS) জানিয়েছে, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি স্থানীয় সময় বিকেল ৩টার দিকে ওয়নসান এলাকা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। প্রাথমিকভাবে এটিকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং এটি হোয়াসং-১১ সিরিজের হতে পারে বলে ধারণা করছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।
এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর, বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে একই এলাকা থেকে দ্বিতীয় একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর হিসাবে সেটি ৬০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে সাগরে গিয়ে পড়ে। দুই ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট ধরন ও সক্ষমতা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ চালাচ্ছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা বা EEZ-এর বাইরে গিয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ বা বিমানের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
উৎক্ষেপণের ঘটনায় জাপান উত্তর কোরিয়ার কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেন, এ ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের লঙ্ঘন এবং জাপানের জনগণের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর বিষয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উৎক্ষেপণের শুরু থেকেই উত্তর কোরিয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে। দুই দেশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসংক্রান্ত তথ্য পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করেছে এবং জাপানের সঙ্গেও তথ্য ভাগ করেছে।
উৎক্ষেপণের পর দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় জরুরি বৈঠক করে। দেশটির পক্ষ থেকে পিয়ংইয়ংকে এ ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সর্বশেষ উৎক্ষেপণের মাত্র আট দিন আগে, ১২ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া ওয়নসান এলাকা থেকে পূর্ব সাগরের দিকে একাধিক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল।
পরে উত্তর কোরিয়া জানিয়েছিল, ওই উৎক্ষেপণ ছিল গোলাবর্ষণ মহড়ার অংশ। এতে কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, আক্রমণাত্মক ড্রোন, কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছিল।
সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছিল পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক মহড়ার সমালোচনা করে প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড জানিয়েছে, তারা উত্তর কোরিয়ার উৎক্ষেপণ সম্পর্কে অবগত এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্রদের ভূখণ্ড বা সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের একদিন আগে উত্তর কোরিয়া দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পিয়ংইয়ং একই সময়ে নিজেদের পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের সামরিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। তবে সর্বশেষ উৎক্ষেপণের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:







