মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার ইউরোপের বিমান চলাচল খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে জেট ফুয়েল সরবরাহের একটি বড় অংশ ব্যাহত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি বাড়ানো হলেও চতুর্থ প্রান্তিকে ইউরোপে জেট ফুয়েলের বড় ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ইউরোপে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল জেট ফুয়েলের ঘাটতি হতে পারে। একই সময়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ হাজার ব্যারেল উদ্বৃত্ত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের জেট ফুয়েল আমদানির প্রচলিত প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের জেট ফুয়েল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে ইউরোপকে এখন অনেক দূরের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি এখন দক্ষিণ কোরিয়াও ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠছে।
সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইউরোপে জেট ফুয়েল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবরের পর এটি সর্বোচ্চ মাত্রা।
দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি উৎপাদনও বেড়েছে। জুলাইয়ে দেশটির জেট ফুয়েল উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩৮৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের হার দৈনিক প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেলে ওঠে—জুনের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ এশিয়ায় অতিরিক্ত উৎপাদন থাকায় ইউরোপের ঘাটতি পূরণে এশিয়ার জ্বালানি এখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাচ্ছে।
শুধু আমদানির সংকট নয়, ইউরোপের নিজস্ব জেট ফুয়েল মজুতও উদ্বেগ তৈরি করছে।
আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প বা ARA অঞ্চলের জেট ফুয়েল মজুত সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে শেষ হওয়া সপ্তাহে সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি বাণিজ্য ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের মজুত কমে যাওয়ায় নতুন করে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাজারে চাপ আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
ইউরোপের ঘাটতি পূরণে আফ্রিকার নাইজেরিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির Dangote refinery থেকে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার ব্যারেল জেট ফুয়েল সরবরাহ হয়েছে বলে বাজার-তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর ইউরোপের বাজারে জেট ফুয়েলের বাণিজ্যিক রুট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
সরবরাহ সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে দেখা যাচ্ছে। জেট ফুয়েল ছাড়াও ডিজেল ও অন্যান্য মধ্যম-ডিস্টিলেট জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ডিজেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এশিয়া ও ইউরোপের বাজারদরের পার্থক্য বাড়ায় এশিয়া থেকে ইউরোপে জ্বালানি পাঠানো ব্যবসায়ীদের জন্য আরও লাভজনক হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ থেকে ইউরোপমুখী জ্বালানি সরবরাহ আরও বাড়তে পারে।
জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয়ে। জ্বালানি একটি বিমান সংস্থার বড় ব্যয়গুলোর একটি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট তৈরি হলে এয়ারলাইনগুলোকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতে পারে।
এর সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে—বিমান টিকিটের দাম বাড়ানো, কিছু কম লাভজনক রুটের সক্ষমতা কমানো অথবা নতুন ফ্লাইট বৃদ্ধির পরিকল্পনা ধীর করা।
তবে বর্তমানে ইউরোপজুড়ে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল বা জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং ঝুঁকিটি মূলত আগামী মাসগুলোতে সরবরাহ আরও সংকুচিত হলে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশনের Oil Coordination Group জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাৎক্ষণিক তেল সরবরাহ সংকট দেখা দেয়নি। ইউরোপীয় রিফাইনারিতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজার থেকে বিকল্প সরবরাহের মাধ্যমে জেট ফুয়েল ও ডিজেলের চাহিদা মেটানো হচ্ছিল। বাণিজ্যিক ও জরুরি মজুতও তখন পর্যাপ্ত ছিল
তবে কমিশন একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং শরৎ-শীত মৌসুমে স্বাভাবিক চাহিদা বাড়লে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে জ্বালানি বাজার আরও সংকুচিত হতে পারে।
এর আগে মে মাসে ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জেট ফুয়েল সরবরাহ কমেছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জেট ফুয়েল সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ।
এই পথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ইউরোপের বাজারে স্বাভাবিকভাবে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ইউরোপকে আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা কিংবা এশিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
ফলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহে সময়—দুটিই বাড়ে।
ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয় এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
Energy Aspects-এর পূর্বাভাস সত্যি হলে চতুর্থ প্রান্তিকে দৈনিক ৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলের জেট ফুয়েল ঘাটতি ইউরোপের বিমান পরিবহন খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও পড়ুন:







