News Ticker
221.png

ধ্বংসস্তূপের মাঝে ৩ বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরল গাজার শিশুরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:০১

শেয়ার

শেয়ার

ধ্বংসস্তূপের মাঝে ৩ বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরল গাজার শিশুরা
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে গাজার হাজার হাজার শিশু। তবে তাদের সেই ‘ফিরে আসা’ কোনো স্বাভাবিক স্কুলে নয়—কোথাও তাঁবুতে, কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে, আবার কোথাও অস্থায়ী কাঠামোর নিচে বসেই শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বই-খাতা হাতে নিয়ে শিক্ষার পথে ফিরতে চাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। 

গাজার শিক্ষা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরেছে। অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে গাজার শিক্ষা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় সরাসরি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। 

গাজার বহু এলাকায় স্কুল ভবন আর আগের অবস্থায় নেই। ইউনিসেফের এপ্রিল ২০২৬-এর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৯৩ শতাংশের বেশি ভবনের বড় ধরনের সংস্কার অথবা পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।

ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষে অনেক শিশুর শ্রেণিকক্ষ হয়েছে তাঁবু। কোনো কোনো তাঁবুতে নেই চেয়ার-টেবিল, নেই পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। কোথাও শিশুরা মেঝেতে বিছানো ম্যাটের ওপর বসে পাঠ নিচ্ছে। কিছু অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে একটি বোর্ড থাকলেও প্রয়োজনীয় অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ অপ্রতুল। 

নুসেইরাত ও খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব স্থানে যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যেও বহু শিশু পড়াশোনায় ফিরছে।

খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়াইয়াদ আবু মুস্তাফা প্রায় তিন বছর পর স্কুলে ফেরার আনন্দের কথা জানিয়েছে। তবে আনন্দের সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধের স্মৃতি ও নানা অভাব।

রয়টার্সকে সে জানায়, তাঁবুর ভেতর ভালো বাতাস চলাচল নেই, নেই পর্যাপ্ত আসন; শিক্ষার্থীদের মাদুরের ওপর বসতে হচ্ছে। অনেকের কাছে নেই খাতা, কলম কিংবা প্রয়োজনীয় পোশাক। তারপরও তার ভাষায়, এসব বাধার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। 

আরেক শিক্ষার্থী সামার আবু সালমি জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় তারা ফোনের মাধ্যমে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছে। এখন তাঁবু থেকে তাঁবুতে ফিরে তারা আবারও শিক্ষার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে চায়। 

শিশুদের কাছে স্কুলে ফেরার দিনটি আনন্দের হলেও যুদ্ধের ভয় এখনো তাদের পিছু ছাড়েনি। অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মা, আত্মীয় কিংবা বন্ধু হারিয়েছে। কেউ কেউ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

গাজার একটি অস্থায়ী স্কুলের ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরা জানান, আগে স্কুলে যাওয়ার জন্য সকালে আনন্দ নিয়ে ঘুম থেকে উঠলেও এখন স্কুলে যাওয়ার সময়ও গুলি, রকেট ও হামলার ভয় কাজ করে। 

যুদ্ধের কারণে গাজায় শিক্ষা অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে বই, খাতা, কলম, পোশাক ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক ব্যবসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগে যে খাতার দাম ছিল প্রায় ৩ শেকেল, সেটি এখন ১৫ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারের কাছে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর মৌলিক খরচও বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। 

কিছু শিক্ষার্থী স্কুলব্যাগের পরিবর্তে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে ক্লাসে আসছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলো শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের চেষ্টা করছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গাজার ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন শিক্ষাবর্ষ আনুষ্ঠানিক সরাসরি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে কোনো সরাসরি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা পায়নি। 

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, গাজার শিক্ষা খাতের শিক্ষক ও কর্মীরাও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গাজার শিক্ষা কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৭৭০-এর বেশি শিক্ষা খাতের কর্মী নিহত হয়েছেন। এই হিসাবের মধ্যে ৫৩২ জন শিক্ষক রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতেও শিক্ষকরা অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিম গাজার শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে মেঝেতে বসেই পড়ছে; কোনো কোনো তাঁবুতে বোর্ডও নেই। তবু শিক্ষকদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া।

গাজার নতুন শিক্ষাবর্ষ চালু করতে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা সহায়তা করছে। অস্থায়ী তাঁবু স্কুল, শিক্ষা কেন্দ্র এবং অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। 

ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত কিছু অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্রে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। যেসব শিশু সরাসরি ক্লাসে যেতে পারছে না বা গাজার বাইরে চলে গেছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থাও চালু রাখার কথা জানিয়েছে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ। 

গাজার বহু স্কুল ভবন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও শিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরিবর্তে অস্থায়ী ব্যবস্থায় তাদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তাঁবু, মেঝে, সীমিত বই-খাতা কিংবা অনিশ্চিত পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যেও শিশুরা আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।

প্রায় তিন বছর পর তাদের এই প্রত্যাবর্তন তাই গাজার শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পূর্ণ চিত্র নয়; বরং ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও শিক্ষা চালু রাখার একটি প্রচেষ্টা। স্থায়ী স্কুল ভবন পুনর্গঠন, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। 

সূত্র: রয়টার্স

ChannelNRB Footer