যেখানে সাধারণত বৃষ্টির দেখা মেলে খুবই কম, মাটি থাকে শুষ্ক ও পাথুরে—সেই মরুভূমিই এখন রঙিন ফুলে ছেয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির আতাকামা মরুভূমিতে। বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অমেরু মরুভূমি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল অস্বাভাবিক বৃষ্টির পর এখন পরিণত হয়েছে বিশাল এক প্রাকৃতিক ফুলের বাগানে।
চিলিতে এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনাকে বলা হয় ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ (Desierto Florido)—অর্থাৎ ‘ফুলে ভরা মরুভূমি’। বেগুনি, সাদা, গোলাপি, হলুদসহ নানা রঙের ফুলে মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন যেন ছবির মতো সুন্দর হয়ে উঠেছে।
আতাকামা পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল। কিন্তু ২০২৬ সালের শীতকালে চিলির উত্তরাঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই অতিরিক্ত আর্দ্রতা মরুভূমির মাটির নিচে দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকা বীজকে সক্রিয় করে তুলেছে।
চিলির আতাকামা আঞ্চলিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে হওয়া ব্যতিক্রমী বৃষ্টিপাতের পর এ বছর বড় পরিসরে ‘ফুলের মরুভূমি’ দেখা দেওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আতাকামার শুষ্ক মাটিতে বছরের পর বছর অসংখ্য উদ্ভিদের বীজ সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পেলে এসব বীজ অঙ্কুরিত হয়ে দ্রুত ফুল ফুটিয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির পর মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা তৈরি হওয়াই এই প্রক্রিয়ার প্রধান শর্ত। নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত পরিস্থিতি তৈরি হলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল এলাকায় ফুলের বিস্তার ঘটতে পারে।
এই ফুলেল উৎসবে শুধু একটি বা দুটি প্রজাতির ফুল নয়, দেখা যেতে পারে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির স্থানীয় উদ্ভিদ। ফুলের রঙেও রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য—বেগুনি, গোলাপি, হলুদ, সাদা ও লাল রঙের ফুলে বদলে যায় মরুভূমির স্বাভাবিক চেহারা।
২০২৬ সালের ফুল ফোটার মৌসুমকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মনে করা হচ্ছে। চিলির পর্যটন কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছরের ফুলের বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় বড় হতে পারে এবং প্রায় ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এর প্রভাব দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে আতাকামার বিভিন্ন এলাকায় ফুল ফুটতে শুরু করেছে। চিলির আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ফুলের বিস্তার বাড়বে এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ফুলের সংখ্যা, বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই কোপিয়াপোর কাছে ফুলের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা গেছে। ড্রোনে ধারণ করা ছবিতে শুষ্ক পাহাড় ও পাথুরে ভূমির মাঝখানে বেগুনি ও সাদা ফুলের বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আতাকামার এই ফুলেল পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে এল নিনো পরিস্থিতির সময় চিলির কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে, যা মরুভূমিতে ফুল ফোটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু বৃষ্টিপাত হলেই যে প্রতিবছর একই মাত্রায় ফুল ফুটবে, এমন নয়। বৃষ্টির পরিমাণ, তাপমাত্রা, মাটির আর্দ্রতা ও দিনের আলোর মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে অনুকূল হতে হয়।
ফুলে ভরা আতাকামা এখন পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের বিশেষ আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে। শুষ্ক পাহাড়, পাথুরে ভূমি আর তার ওপর ছড়িয়ে থাকা রঙিন ফুল—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিরল প্রাকৃতিক দৃশ্য।
চিলির সরকারি কর্তৃপক্ষ এ সময় পর্যটকদের দায়িত্বশীলভাবে ফুল দেখার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ফুলের এই সৌন্দর্য সাময়িক এবং এর সঙ্গে মরুভূমির সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক রয়েছে।
আরও পড়ুন:







