দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পারমাণবিক যুগের একটি পুরোনো পরিবেশগত সংকট নতুন করে সামনে এসেছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ উত্তর-পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরের গভীর সমুদ্রে ২ লাখেরও বেশি ব্যারেলে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলে দেয়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গভীরে থাকা এসব ব্যারেলের একটি অংশ এখন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভেঙে গেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বর্জ্য আশপাশের সমুদ্রতলে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে।
ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা CNRS, ফরাসি সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান Ifremer এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ধারাবাহিক অভিযানে ওই এলাকার ব্যারেলগুলোর অবস্থা ও সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পরীক্ষা করেন।
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু উত্তর-পূর্ব আটলান্টিকের একটি বিশাল গভীর সমুদ্র অঞ্চল। ফরাসি উপকূল থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৭০০ মিটার গভীরে ব্যারেলগুলো পড়ে আছে। এলাকাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থিত এবং কয়েক দশক ধরে সেখানে বিভিন্ন দেশের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলা হয়েছিল।
CNRS-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো মিলে ২ লাখের বেশি ২০০-লিটারের ধাতব ব্যারেল সমুদ্রে ফেলে। এসব ব্যারেলের ভেতরে থাকা বর্জ্য অনেক ক্ষেত্রে বিটুমিন বা কংক্রিটের মতো পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা হয়েছিল।
পারমাণবিক শিল্পের শুরুর যুগে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। তখন গভীর সমুদ্রের তলদেশকে মানুষের বসতি ও স্থলভাগ থেকে অনেক দূরে, স্থিতিশীল এবং তুলনামূলকভাবে প্রাণহীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
এই ধারণা থেকেই গভীর সমুদ্রে ব্যারেল ফেলার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, গভীর সমুদ্রের তলদেশ মোটেও প্রাণহীন নয়; সেখানে মাছ, অণুজীব, প্রবাল, স্পঞ্জ, অ্যানিমোনসহ বিভিন্ন প্রাণী বসবাস করে।
২০২৫ সালের অভিযানে স্বয়ংক্রিয় গভীর সমুদ্র রোবট Ulyx ব্যবহার করে গবেষকেরা ওই বিশাল এলাকার একটি অংশের সমুদ্রতল ম্যাপ করেন। মাত্র প্রায় ২ শতাংশ এলাকা জরিপ করেই তারা প্রায় ৩,৫০০ ব্যারেল শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় অভিযানে গবেষকেরা আরও কাছ থেকে কয়েকটি ব্যারেল পরীক্ষা করেন। সেখানে এমন ব্যারেল পাওয়া যায় যেগুলোর ধাতব আবরণ মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং কিছু ব্যারেলের ভেতরের উপাদান আশপাশের সমুদ্রতলে ছড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যারেলের কাছাকাছি এলাকায় গবেষকেরা প্রত্যাশার চেয়ে উচ্চতর তেজস্ক্রিয়তার সংকেত শনাক্ত করেছেন। পরীক্ষায় কোবাল্ট-৬০ (Cobalt-60) এবং নিওবিয়াম-৯৪ (Niobium-94)-এর মতো তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা যে তেজস্ক্রিয়তার সংকেত পেয়েছেন, তা মূলত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যারেলের অত্যন্ত কাছাকাছি এলাকায় বেশি দেখা গেছে। পুরো আটলান্টিক মহাসাগর বা উপকূলীয় এলাকায় বিপজ্জনক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের তুলনামূলকভাবে দূরের নমুনা পরীক্ষায় ওই এলাকায় সামান্য তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন পাওয়া গেলেও তা ফ্রান্সের কিছু দূষিত এলাকার মাত্রার চেয়ে বেশি ছিল না। ২০২৬ সালের অভিযানে ব্যারেলের কাছাকাছি গিয়ে তুলনামূলক বেশি সংকেত পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, এসব ব্যারেলে উচ্চমাত্রার পারমাণবিক জ্বালানি বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি থাকার কথা নয়। বরং ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম, গ্লাভসসহ তুলনামূলকভাবে কম বা খুব কম মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য থাকার কথা।
তবে সব ব্যারেলের সুনির্দিষ্ট উপাদান সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য নেই। তাই বর্তমানে গবেষণার একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে—কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ কোথায় রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সেগুলো কীভাবে পরিবেশে ছড়াচ্ছে, তা বোঝা।
ব্যারেলগুলো শুধু বর্জ্য বহন করছে না; বহু সামুদ্রিক প্রাণী এগুলোকে বসবাসের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে।
২০২৬ সালের অভিযানে বিজ্ঞানীরা ব্যারেলের গায়ে ও আশপাশে মাছ, অ্যানিমোন, প্রবাল, সামুদ্রিক শসা এবং বিভিন্ন ধরনের স্পঞ্জ দেখতে পান। কিছু ব্যারেলকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে।
যখন এসব বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা হয়েছিল, তখন ধারণা ছিল গভীর সমুদ্রের পরিবেশ এগুলোকে দীর্ঘদিন আটকে রাখবে। কিন্তু কয়েক দশক পর ধাতব ব্যারেলের ক্ষয় শুরু হয়েছে।
গবেষকদের বর্তমান অনুসন্ধান তাই শুধু ব্যারেলগুলো কোথায় আছে তা খুঁজে বের করার জন্য নয়; বরং তেজস্ক্রিয় পদার্থ কীভাবে ব্যারেল থেকে বের হচ্ছে, সমুদ্রতলের পলিতে কীভাবে জমা হচ্ছে এবং সামুদ্রিক জীবের ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন:







