দুই দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের চিকিৎসা করেছেন। চিকিৎসক হিসেবে ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত পরিচিতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব, সরকারি পরিদর্শন এবং রোগী-হাসপাতাল বিরোধের চাপ তাঁকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২০ বছরের বেশি সময়ের চিকিৎসকজীবন ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশা বেছে নেন চীনের এক নারী চিকিৎসক।
এখন তিনি রোগী দেখেন না; বরং ভোর থেকে তৈরি করেন ভাপে রান্না করা পুরভরা বান। নিজের ছোট ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত তাঁর দিন কাটছে।
চীনের হুবেই প্রদেশের উহানের ৪৮ বছর বয়সী তুং মিন ২০২৩ সালে চিকিৎসা পেশা ছেড়ে বান রুটির ব্যবসায় নামেন। বর্তমানে তাঁর দুটি দোকান রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় দোকানটি চালু করেন তিনি।
তুং মিন ১৯৯৯ সালে উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর শেনজেনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
কয়েক বছর পর তিনি উহানে ফিরে যান। সেখানে তাঁর মা একটি বেসরকারি ক্লিনিক পরিচালনা করতেন। মাকে সহযোগিতা করতে তুংও সেই কাজে যুক্ত হন।
পরবর্তীতে তাঁর মা অবসর নেওয়ার পর ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর মা-মেয়ে নিজেদের বাড়ি হুবেই প্রদেশের থিয়ানমেনে ফিরে যান। সেখানে তুং একটি ছোট কমিউনিটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি হাসপাতালের আইনগত প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করেন।
তুং মিনের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কাজ শুধু রোগী দেখা বা চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শন, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং অন্যান্য অচিকিৎসাসংক্রান্ত কাজও সামলাতে হতো।
বিশেষ করে হাসপাতালের আইনগত প্রতিনিধি হওয়ার কারণে কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হলে তার দায়ভারও তাঁকে বহন করতে হতো।
চিকিৎসকজীবনের শেষ দিকে এসব বিষয় তাঁর ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। কয়েকবার পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথাও তাঁর মনে হয়েছিল।
চিকিৎসক থাকা অবস্থাতেই ২০২৩ সালে তুং মিনের বান রুটির ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এক বন্ধুর পরিবারের বান তৈরির ব্যবসা দেখে তিনি সেখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
তবে ব্যবসায় নামার পরই আসে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। দোকানের প্রধান কারিগর হঠাৎ কাজ ছেড়ে দিলে দোকানটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
তখন তুং নিজেই বান তৈরি শেখার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে তাত্ত্বিকভাবে প্রক্রিয়াটি শেখেন, এরপর হাতে-কলমে বান তৈরি শুরু করেন। খুব দ্রুত কাজটি আয়ত্তে চলে আসে। আর যত বেশি বান তৈরি করতে থাকেন, কাজটির প্রতি ততই আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।
বান তৈরির কাজ করতে গিয়ে তুং মিন বুঝতে পারেন, নতুন এই পেশায় তিনি অন্য ধরনের স্বস্তি পাচ্ছেন। একপর্যায়ে ২০২৩ সালে চিকিৎসকজীবন পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে বান রুটির ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।
তাঁর এই সিদ্ধান্তে শুরুতে পরিবার বিস্মিত ও অসন্তুষ্ট হয়েছিল। কারণ চিকিৎসক পেশাকে পরিবারে অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখা হতো।
তবে তুং নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—জীবন সীমিত; তাই অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী না চলে নিজের পছন্দের জীবনও বেছে নেওয়া দরকার। পরে তাঁর মা ও ভাই সিদ্ধান্তটি মেনে নেন এবং ব্যবসায় তাঁকে সহযোগিতা করতে শুরু করেন।
চিকিৎসকজীবন ছেড়ে নেওয়ার পর তাঁর কাজের সময় কিন্তু কমেনি। প্রতিদিন ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় দোকানের কাজে ব্যয় করেন তিনি।
ভোরেই শুরু হয় প্রস্তুতি। ময়দার খামির তৈরি, পুর প্রস্তুত করা, বান তৈরি এবং ভাপে রান্না—সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় দোকানে থাকতে হয়।
শারীরিক পরিশ্রম চিকিৎসকের কাজের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু তুং মিনের কাছে পার্থক্যটা অন্য জায়গায়—এই কাজ তাঁকে আগের মতো মানসিক চাপ দেয় না। বরং ব্যস্ততা ও ক্লান্তির মধ্যেও তিনি নিজেকে বেশি সুখী মনে করেন।
২০২৩ সালে ব্যবসা শুরু করার পর ধীরে ধীরে ক্রেতা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যবসাটি এতটাই স্থিতিশীল হয় যে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় দোকান চালু করেন তুং।
অর্থাৎ চিকিৎসকজীবন ছেড়ে নতুন পেশায় আসার তিন বছরের মধ্যেই তাঁর ব্যবসা দ্বিতীয় শাখায় পৌঁছেছে।
শুরুতে তুংয়ের পরিবার তাঁর সিদ্ধান্ত বুঝতে পারেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়।
তাঁর মা ও ভাই এখন ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর মা নিজেও বান তৈরির কাজে যুক্ত হয়েছেন।
পরিবারের সমর্থন পাওয়ার পর তুংয়ের নতুন জীবনের পথ আরও সহজ হয়েছে।
চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দিলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা সম্পর্কেও নিজে পড়াশোনা করছেন এবং ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যজ্ঞান ও খাদ্যব্যবসাকে কোনোভাবে একসঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৫ সাল থেকে তিনি নিজের দোকারের প্রচারের জন্য ছোট ভিডিও তৈরিও শেখেন। শুরু থেকে শিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী তৈরি করেছেন।
তুং মিনের গল্পের মূল বার্তা তাঁর নিজের কথাতেই সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে ওঠে। তিনি মনে করেন, জীবনে কোনো একটি নির্দিষ্ট পথকেই শেষ কথা হিসেবে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।
চিকিৎসক হিসেবে দুই দশকের বেশি সময় কাটানোর পর ৪৫ বছর বয়সে তিনি পেশা বদলেছেন। এখন ৪৮ বছর বয়সে বান রুটির ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং দ্বিতীয় দোকানও খুলেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই। যতদিন শারীরিকভাবে কাজ করতে পারবেন, ততদিন নিজের বান রুটির দোকান চালিয়ে যেতে চান।
আরও পড়ুন:







