যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায় নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকা ভবনেও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো মানুষ। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই—তাই মাথার ওপর ভাঙা ছাদ, ফাটল ধরা দেয়াল কিংবা হেলে পড়া ভবনই অনেক পরিবারের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে গাজার এমন কয়েকটি পরিবারের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। গাজা সিটির একটি আংশিক ধসে পড়া ভবনে বসবাস করছেন ৬০ বছর বয়সী মাসাদা আবু জারাদ ও তার পরিবার। ভবনের ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে, বেরিয়ে আছে কংক্রিট ও বাঁকানো রড। ভবনটি বিপজ্জনক হওয়ায় ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট ও সিভিল ডিফেন্স পরিবারটিকে সরে যাওয়ার সতর্কতা দিলেও নিরাপদ বিকল্প না থাকায় তারা সেখানেই অবস্থান করছেন।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বহু ভবন এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেগুলোর দেয়াল, ছাদ ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয় (OCHA) জানিয়েছে, নিরাপদ আবাসনের অভাবে গাজার শত শত ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বহু মানুষ আশ্রয় নিয়ে আছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ছয়তলা আবাসিক ভবন ধসে ২১ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২ শিশুও ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
ওই ভবনে অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। ভবনটি ধসের কিছুক্ষণ আগে সেখানে ফাটল দেখা দেওয়ায় কয়েকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিকল্প ছিল না।
ফিলিস্তিনের সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ২৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, গাজায় আনুমানিক ২ হাজার ভবন ও আবাসিক ইউনিট ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থাপনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখনো বসবাস করছেন। নিরাপদ আবাসন ও পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবকেই এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, সামনে শীত ও বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বৃষ্টি ও শক্তিশালী বাতাস ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাঠামোকে আরও দুর্বল করে ধসের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের জন্য তাঁবু একটি বিকল্প হলেও সেটিও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারছে না। বৃষ্টি, ঠান্ডা, ঝড় এবং পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, শীতের আগে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও বন্যাপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু তাঁবু, ত্রিপল, নির্মাণসামগ্রী, ভারী যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি মানবিক কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলছে।
১৬ সেপ্টেম্বরের ভবনধস গাজায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় বসবাসের বিপদকে নতুন করে সামনে এনেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই ভবনে প্রায় ১০০ মানুষ বসবাস করছিলেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন ছিল শিশু।
উদ্ধারকাজেও রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষ সরঞ্জামের ঘাটতির কথা জানিয়েছে মানবিক সংস্থাগুলো। ফলে ভবন ধসে পড়ার পর আটকে পড়াদের দ্রুত উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
গাজার বাসিন্দাদের জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে থাকলে ধসের ঝুঁকি, আর তাঁবুতে থাকলে বৃষ্টি ও ঠান্ডার ঝুঁকি—দুই দিকেই বিপদ।
জাতিসংঘ বলছে, শীতের আগে নিরাপদ ও টেকসই আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন শনাক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে মানুষ সরানো এবং ধ্বংসাবশেষ অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো দরকার।
গাজাবাসীর সংকট তাই শুধু যুদ্ধ বা খাদ্য ও চিকিৎসার সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। এখন নিজের মাথার ওপর যে ছাদটুকু আছে, সেটিও কখন ধসে পড়ে—এই আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটছে বহু পরিবারের। নিরাপদ বিকল্প না থাকায় যে ভবন থেকে তাদের চলে যেতে বলা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সেই ভবনই তাদের কাছে হয়ে উঠছে শেষ আশ্রয়।
আরও পড়ুন:







