News Ticker
221.png

নেপালে ভয়াবহ বন্যার এক মাস, এখনো নিখোঁজ ৫,৭০০ মানুষ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৪৪

শেয়ার

শেয়ার

নেপালে ভয়াবহ বন্যার এক মাস, এখনো নিখোঁজ ৫,৭০০ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের এক মাস পরও স্বাভাবিক হয়নি নেপালের পরিস্থিতি। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় দেশটির সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ হয়ে যায়। এক মাস পরও ৫,৭০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকলেও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, বিপুল পরিমাণ কাদা-পাথর ও ধ্বংসস্তূপের কারণে নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ১,৪৫১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে কয়েক শ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক ছাড়াও বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গত ২৬ আগস্ট নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। সেই ধসের ধ্বংসাবশেষ নিচের হিমবাহে আঘাত করার পর নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর নেমে এসে নদী তীরবর্তী জনপদগুলোতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

ভূতাত্ত্বিকদের হিসাবে, ধ্বংসাবশেষ প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে রসুওয়াগাধি এলাকায় পৌঁছে যায়। এর ফলে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বহু বাড়িঘর, সড়ক ও অবকাঠামো। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীসংলগ্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। অনেক শ্রমিক তখন প্রকল্পের ভেতরের টানেল ও স্থাপনায় কাজ করছিলেন।

উদ্ধারকারীদের জন্য এসব টানেল এখন সবচেয়ে কঠিন অনুসন্ধানস্থলগুলোর একটি। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সময় লাগছে। ভারী যন্ত্রপাতি, ড্রিলিং ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। 

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও মিলেছে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার ঘটনা। কয়েকজন শ্রমিককে টানেল থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন প্রায় ১০ দিন অন্ধকারে আটকে থাকার পর উদ্ধার হন এবং বেঁচে থাকার জন্য কাদামিশ্রিত পানি পান করেছিলেন বলে জানান। 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে মরদেহ শনাক্তকরণের জটিলতায়। উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে। এর আগে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উদ্ধার হওয়া মরদেহের মাত্র একটি ছোট অংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। 

মরদেহ রাখার জায়গার সংকট তৈরি হওয়ায় প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অনেক মরদেহ সাময়িকভাবে দাফনও করা হয়েছে। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

এই দুর্যোগে নেপালের বহু মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকা নষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় এখনো ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। বহু পরিবার জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হেলিকপ্টার ও অন্যান্য মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জরুরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। নেপাল সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে। 

বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষের জন্য সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে শীত। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও রসুওয়া অঞ্চলে শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে। ফলে আশ্রয়, কম্বল, উষ্ণ পোশাক, খাবার ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর প্রয়োজন বাড়ছে।

ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও এক মাস পর অনেক এলাকায় জরুরি সহায়তার গতি কমে আসছে বলে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদগুলো পুনর্গঠনে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বন্যার এক মাস পরও নেপালের হাজারো পরিবার জানে না তাদের স্বজনদের কী হয়েছে। কেউ নিখোঁজ স্বজনের জীবিত ফেরার অপেক্ষায়, আবার কেউ মরদেহ শনাক্ত হওয়ার আশায় দিন গুনছেন।

উদ্ধারকারীরা এখনো কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত ও পরিবারগুলোর পুনর্বাসনই নেপালের সামনে বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ChannelNRB Footer