News Ticker
221.png

গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০৮

শেয়ার

শেয়ার

গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে ভয়াবহ মানবিক ও কারিগরি সংকটের মুখে পড়েছে গাজা। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর হিসাবে, উপত্যকাটিতে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। এর নিচে এখনো ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে জাতিসংঘের হিসাবে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘ বলছে, এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সরাতেই অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি এতে খরচ হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন দীর্ঘমেয়াদি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

UNDP-এর ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজায় মোট ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬১ মিলিয়ন টন। গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজার ধ্বংসাবশেষ তার প্রায় ২০ গুণ।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছে ভেঙে পড়া ভবনের কংক্রিট, ইট, ধাতব কাঠামো, বৈদ্যুতিক ও নির্মাণসামগ্রীসহ নানা ধরনের বর্জ্য। এর সঙ্গে মিশে আছে বিস্ফোরিত ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ এবং মানবদেহের অবশেষ।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি হলো এর নিচে মানুষের মরদেহের উপস্থিতি। UNDP-এর হিসাব অনুযায়ী, ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মরদেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকতে পারে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও জানিয়েছে, গাজায় ধ্বংস হওয়া ভবনের নিচ থেকে এখনো মানবদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স ৬৩০টির বেশি মরদেহ ও মানবদেহের অবশেষ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি হতে পারে।

ফলে শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানো নয়, মরদেহ শনাক্ত করা, ফরেনসিক পরীক্ষা, পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করাও এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপের তুলনায় এখন পর্যন্ত সরানো হয়েছে খুবই সামান্য অংশ। UNDP-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়েছে এবং আরও ৩ লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। মোট ধ্বংসস্তূপের তুলনায় এটি মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। 

এ পর্যন্ত প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। এর ফলে কিছু এলাকায় ত্রাণবাহী ট্রাক, জরুরি কর্মী এবং বাসিন্দাদের চলাচল সহজ হয়েছে। তবে পুরো গাজার তুলনায় এই অগ্রগতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গাজায় থাকা অধিকাংশ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও পুরোনো হয়ে গেছে। যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন অয়েল ও অন্যান্য সামগ্রীরও সংকট রয়েছে। 

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি মেরামত করে এবং ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহার করে কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে।

গাজার ধ্বংসস্তূপে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বড় ঝুঁকি হলো অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ। ধ্বংস হওয়া ভবনের ভেতরে বা সড়কের নিচে থাকা এসব বিস্ফোরক যেকোনো সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। 

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মাইন অপসারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। তবে গাজায় বিস্ফোরক অপসারণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সব অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ দ্রুত সরানো সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অ্যাসবেস্টসসহ অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ রয়েছে। আংশিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বল ভবনও উদ্ধারকর্মী ও ফিরে আসা বাসিন্দাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। 

UNDP ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (ICRC) মতো সংস্থাগুলো এমন স্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যেখানে মানবদেহ চাপা পড়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব স্থানকে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। 

ধ্বংসস্তূপ সরানো গাজার পুনর্গঠনের প্রথম ধাপগুলোর একটি। কিন্তু বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ, অবিস্ফোরিত অস্ত্র, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে কাজটি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, ধ্বংসস্তূপের বড় অংশ সরাতেই ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। এর পরেও ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, সড়ক, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনর্গঠনের বিশাল কাজ বাকি থাকবে।

ChannelNRB Footer