দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলে একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। সর্বশেষ একটি মরদেহ উদ্ধারের পর গত জুলাই থেকে ওই অঞ্চলে উদ্ধার হওয়া নারীর মরদেহের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। ঘটনাগুলোর মধ্যে কিছু মিল পাওয়ায় সম্ভাব্য সিরিয়াল কিলারের আশঙ্কায় তদন্ত জোরদার করেছে পুলিশ। তবে এখনো সব হত্যাকাণ্ড একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্যিক রাজধানী জোহানেসবার্গের পূর্বে Ekurhuleni পৌর এলাকায় এসব মরদেহ পাওয়া গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে Ekurhuleni এলাকায় কাছাকাছি স্থান থেকে তিন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের শুরুতে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে আরও ছয় নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। এতে সম্ভাব্য ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।
১৭ সেপ্টেম্বর আরও এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় নয়জনে। ২৬ সেপ্টেম্বর দশম নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে। এর একদিন পর আরও একজন নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। ফলে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১১টি নারীর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ মরদেহটি Ekurhuleni পৌরসভার একটি খোলা মাঠ থেকে উদ্ধার করা হয়। এলাকায় টহলরত একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের গাড়ির কর্মীরা মরদেহটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। নিহত নারীর পরিচয়, বয়স ও মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগজনক মিল রয়েছে। এর মধ্যে কিছু নারীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক নগ্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং কয়েকজনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। কয়েকটি মরদেহ প্রধান সড়কের কাছাকাছি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছিল।
প্রথম দিকের একটি ঘটনায় ১৭ জুলাই এক নারীকে নগ্ন ও কেবল টাই দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় তাঁর প্রেমিককে আটক করা হলেও পরে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আরেক নিহত নারী ৩৮ বছর বয়সী এলিজাবেথ ‘টসন্টসো’ মোসেলাকগোমো। তিনি নিয়মিত দৌড়াতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন এবং কয়েক দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার খবর তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে।
একাধিক মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয়দের মধ্যে সিরিয়াল কিলারের আতঙ্ক তৈরি হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, তারা একই ব্যক্তি, একাধিক ব্যক্তি কিংবা সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনার—সব সম্ভাবনাই বিবেচনায় রাখছেন।
গাউতেং প্রদেশের পুলিশ কমিশনার টমি মথোমবেনি জানিয়েছেন, কিছু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মিল থাকলেও একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো নেই। বিশেষ করে ১৭ সেপ্টেম্বর উদ্ধার হওয়া নবম নারীর হত্যাকাণ্ডকে পুলিশ প্রাথমিকভাবে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখছে; ওই ঘটনায় দুজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনাগুলোর তদন্তে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ সার্ভিস (SAPS) বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে। এতে হত্যা ও ডাকাতি তদন্ত ইউনিটের পাশাপাশি জটিল ও ধারাবাহিক সহিংস অপরাধ তদন্তে বিশেষজ্ঞ Investigative Psychology Unit-এর সদস্যরাও রয়েছেন।
পুলিশ বিভিন্ন ঘটনার আলামত, সময়, ঘটনাস্থল, নিহতদের পরিচয় ও পরিস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
পরপর মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ Ekurhuleni ও আশপাশের এলাকার নারীদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে একা হাঁটা বা নির্জন এলাকায় দৌড়াতে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। সম্ভব হলে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা এবং সন্দেহজনক কোনো ঘটনা দেখলে পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে পুলিশ চার নারীর মরদেহ উদ্ধারের পরই Kempton Park ও Rhodesfield এলাকায় সতর্কতা জারি করেছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, ঘটনাগুলোর মধ্যে মিল এতটাই উদ্বেগজনক যে তদন্ত জোরদারের পাশাপাশি জনসাধারণকে সতর্ক করা প্রয়োজন হয়েছে।
ঘটনাগুলো নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে নারীর নিরাপত্তা ও নারীহত্যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দীর্ঘদিনের বড় সামাজিক সমস্যা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নারী হত্যার হার বিশ্বের অন্যতম উচ্চ। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ঘিরে জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন:







