মঙ্গল গ্রহে একসময় পানি কীভাবে প্রবাহিত ও পরিবর্তিত হয়েছে, সেই রহস্যের নতুন সূত্র পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার পারসিভারেন্স রোভার জেজেরো ক্রেটারের ‘মার্জিন ইউনিট’ এলাকায় পাওয়া শিলার রাসায়নিক ও খনিজগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পেয়েছে যে, ওই অঞ্চলের শিলা অন্তত তিন দফা পানির সংস্পর্শে এসেছিল। এর মধ্যে ছিল ভূগর্ভস্থ পানি, প্রাচীন হ্রদের পানি এবং পরবর্তী সময়ে উষ্ণ ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ।
বিজ্ঞানীরা আগে ধারণা করেছিলেন, জেজেরো ক্রেটারের প্রান্তে থাকা কার্বনেটসমৃদ্ধ শিলাগুলো মূলত প্রাচীন একটি হ্রদের তলদেশে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পারসিভারেন্স সেখানে পৌঁছে ভিন্ন চিত্র দেখতে পায়।
রোভারটির SuperCam যন্ত্র দিয়ে ১৮৫টিরও বেশি শিলাস্তর বা বেডরক লক্ষ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব শিলায় পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার এমন চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা একাধিক সময়ে পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণাটি ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Communications Earth & Environment জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ পানি মঙ্গলের অলিভিনসমৃদ্ধ শিলার সঙ্গে বিক্রিয়া করে। এতে কার্বনেটের স্তর তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের প্রাচীন হ্রদের পানিও শিলাগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শিলায় সিলিকা পাওয়ার বিষয়টিও পানির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য এসেছে তৃতীয় পর্যায়ের পানির উপস্থিতি থেকে। গবেষকেরা কিছু খনিজের শিরা বা vein পেয়েছেন, যার মধ্যে ক্যালসিয়াম সালফেট ও ফ্লোরাইট রয়েছে। ফ্লোরাইট সাধারণত উষ্ণ পানি আগ্নেয় শিলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে তৈরি হতে পারে। ফলে মঙ্গলের এই অঞ্চলে কোনো এক পর্যায়ে উষ্ণ ভূগর্ভস্থ পানির চলাচল হয়েছিল বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
পানির ইতিহাস জানার বিষয়টি শুধু মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি অতীতে সেখানে জীবনের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, সেই প্রশ্নেরও সূত্র দিতে পারে।
পৃথিবীতে পানি যখন অলিভিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন হাইড্রোজেন উৎপন্ন হতে পারে। কিছু অণুজীব এই হাইড্রোজেনকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একই ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার চিহ্ন মঙ্গলের শিলায় পাওয়া যাওয়ায় প্রাচীন মঙ্গল কতটা বাসযোগ্য ছিল, তা নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়।
নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে, মঙ্গলের জলীয় ইতিহাস সম্ভবত একটি সরল হ্রদ বা নদীর গল্প নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে ভূগর্ভস্থ পানি, হ্রদের পানি এবং উষ্ণ পানির প্রবাহ সেখানে সক্রিয় ছিল।
পারসিভারেন্স যে শিলাগুলো বিশ্লেষণ করছে, সেগুলোর কিছু নমুনা ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো সরাসরি গবেষণাগারে পরীক্ষা করা গেলে মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশ এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, জেজেরো ক্রেটারের এই আবিষ্কার মঙ্গলের জলবায়ু কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং গ্রহটি অতীতে কতটা বাসযোগ্য ছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন:







