প্রবল ঝড়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নানটাকেট দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে বালুর নিচ থেকে ভেসে উঠেছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। কাঠের বড় বড় বিম ও লোহার অংশসহ ধ্বংসাবশেষটি ১৮৮৪ সালে ডুবে যাওয়া ‘ওয়ারেন সয়্যার’ (Warren Sawyer) নামের একটি স্কুনারের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী নরইস্টার ঝড়ের প্রভাবে নানটাকেটের উপকূলে ব্যাপক বালু ক্ষয় হয়। এতে দীর্ঘদিন বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজের কাঠামোর অংশ আবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা ডেভিড ডিহার্ট ২৬ সেপ্টেম্বর নানটাকেটের দক্ষিণ উপকূলের পয়েন্ট অব ব্রেকার্স এলাকায় কাঠের কাঠামোটি দেখতে পান। পরে নানটাকেট কারেন্ট-এর সম্পাদক জেসন গ্রাজিয়াদি সেখানে গিয়ে ধ্বংসাবশেষের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
ধ্বংসাবশেষটি এমন একটি এলাকায় পাওয়া গেছে, যেখানে ২০২২ ও ২০২৩ সালেও পুরোনো জাহাজের কাঠামোর অংশ বালুর নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তখন সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেগুলোকে সম্ভাব্যভাবে Warren Sawyer-এর অংশ হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ওয়ারেন সয়্যার ছিল তিন মাস্তুলের একটি কাঠের স্কুনার। ১৮৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর এটি নিউ অরলিন্স থেকে বোস্টনের উদ্দেশে যাত্রা করছিল। জাহাজটিতে ছিল ১ হাজার ১১৫ বেল তুলা এবং ২৮ টন স্ক্র্যাপ লোহা।
প্রবল বাতাসে জাহাজটি নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নানটাকেটের কাছে গিয়ে আটকে যায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন ও সাত সদস্যের ক্রুকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়। পরে জাহাজটি সৈকতে পড়ে থাকলেও কয়েক সপ্তাহ পর আরেকটি ঝড়ে সেটি ভেঙে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা তখন জাহাজের পণ্য উদ্ধারের চেষ্টা করেন। প্রায় ৭০০ বেল তুলা উদ্ধার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ১৮৮৫ সালের ৬ জানুয়ারি আরেকটি ঝড়ে জাহাজটির কাঠামো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং এর বিভিন্ন অংশ সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
নানটাকেটের সৈকতের নিচে বালুর স্তর জাহাজের বিভিন্ন অংশকে দীর্ঘদিন আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নরইস্টার ঝড়ে প্রবল ঢেউ ও উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ বালু সরে যায়। ফলে কাঠের কাঠামো ও মরিচা ধরা লোহার সংযোগ আবার প্রকাশ্যে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানটাকেটের মতো উপকূলীয় এলাকায় বালুর স্তর নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। ফলে বহু বছর ধরে চাপা থাকা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ কখনো ঝড়ের পর দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে, আবার পরবর্তী সময়ে বালুর নিচে চাপা পড়তে পারে।
প্রাথমিকভাবে জাহাজটির ওয়ারেন সয়্যার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। কারণ, নতুন করে পাওয়া ধ্বংসাবশেষটি আগের আবিষ্কারগুলোর কাছাকাছি এলাকায় এবং কাঠামোর ধরনও ঐতিহাসিক জাহাজটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনো শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এটি ওয়ারেন সয়্যার-এরই অংশ। ম্যাসাচুসেটসের Board of Underwater Archaeological Resources এবং Egan Maritime Institute-এর বিশেষজ্ঞরা ধ্বংসাবশেষটি পরীক্ষা করে এর পরিচয় নির্ধারণের কাজ করছেন। প্রাথমিক পরিদর্শনের পরও অন্য কোনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
ওয়ারেন সয়্যার-এর সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ এর আগেও নানটাকেটের সৈকতে দেখা গেছে। ২০২২ সালে প্রায় ৪২ ফুট দীর্ঘ একটি জাহাজের অংশ বালুর নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। ২০২৩ সালের শুরুতেও প্রায় ১৫ ফুট আকারের আরেকটি অংশ দেখা গিয়েছিল।
পরে বালু সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কাঠামো আবার ঢেকে যায়। এবার নতুন ঝড়ে একই অঞ্চলে বড় আকারের কাঠের অংশ দৃশ্যমান হয়েছে।
ধ্বংসাবশেষটি দেখতে স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞরা সেটি স্পর্শ করা, সরানো বা কোনো অংশ সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। ম্যাসাচুসেটসের আইন অনুযায়ী পানির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করা বা সরিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ।
নানটাকেটের আশপাশের সমুদ্র এলাকা ঐতিহাসিকভাবে বিপজ্জনক নৌপথ হিসেবে পরিচিত। এখানে ৭৫০টির বেশি জাহাজডুবির তথ্য রয়েছে। ফলে ঝড়ে ১৪২ বছরের পুরোনো একটি জাহাজের অংশ আবার বালুর নিচ থেকে উঠে আসা দ্বীপটির সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ইতিহাসেরই আরেকটি নিদর্শন হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







