News Ticker
221.png

দীর্ঘ দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনারা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:১৬

শেয়ার

শেয়ার

দীর্ঘ দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনারা
ছবি: সংগৃহীত

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে মার্কিন সেনারা। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটিতে থাকা শেষ মার্কিন সেনাদেরও প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরুর পর যে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ২০২৪ সালে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরাকে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে থাকা শেষ মার্কিন সেনাদেরও প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে অভিযান চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করে। এরপর দেশটিতে মার্কিন সেনাদের বড় ধরনের উপস্থিতি বজায় থাকে। একপর্যায়ে ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি হয়েছিল। 

২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করার পর আবারও মার্কিন সেনারা ইরাকে ফিরে আসে। আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও বিমান সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৭ সালের মধ্যে ইরাকে আইএসের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের পতন ঘটে। 

ইরাকের অধিকাংশ এলাকা থেকে মার্কিন সেনারা এরই মধ্যে সরে গিয়েছিল। তবে উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় ছিল। বিশেষ করে এরবিল এলাকায় মার্কিন ও জোট বাহিনীর স্থাপনা ইরাকে আইএসবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অবশিষ্ট সেনাদেরও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের একটি অংশও ইরাক থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিছু সেনা জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশের আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি না থাকায় ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব আরও বাড়তে পারে। 

অন্যদিকে, ইরাকি সরকারের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। সামরিক মিশন শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইরাকে আইএসের কথিত খেলাফতভিত্তিক ভূখণ্ড বহু বছর আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। তবে সংগঠনটির কিছু সদস্য ও গোপন সেল এখনো সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর গোয়েন্দা তথ্য, বিমান সহায়তা ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি আইএস মোকাবিলায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ইরাকি ও কুর্দি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, মার্কিন সহায়তা কমে গেলে আইএসের অবশিষ্ট সেলগুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে আইএসের পুনরুত্থান নিশ্চিত—এমন কোনো তথ্য বর্তমানে নেই। বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরাকে ইরানের প্রভাব বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও উঠে এসেছে। ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ইরাকের ভেতরে ইরানের প্রভাবের একটি পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে কাজ করত। সেই উপস্থিতি সরে যাওয়ায় তেহরান ও তার মিত্রদের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে কয়েকজন ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করছেন। 

ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক অভিযানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক ইরাকি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মীও নিহত হয়েছেন।

এখন ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ মার্কিন সেনারা ইরাক ছাড়লে দেশটির ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। তবে এরপর ইরাকের নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা, আইএসের অবশিষ্ট তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রভাবের ভারসাম্য—এসব প্রশ্নই সামনে থাকবে।

ChannelNRB Footer