মিয়ানমারের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। নারী ও শিশুরাও রয়েছেন এই দলে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের মধ্যে এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হলো।
মালয়েশিয়া বলছে, এটি একটি স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কর্মসূচি এবং প্রথম ধাপের এই ১ হাজার ৪৭৬ জনসহ মোট প্রায় ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন পরিচয় যাচাই, নথিপত্র এবং দুই দেশের সমন্বয়ের ভিত্তিতে করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মাখজান মাহিউদ্দিনের বরাতে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা বারনামা জানিয়েছে, প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৩৭০ জন পুরুষ, ৭৯ জন নারী, ২০ জন ছেলে ও ৭ জন মেয়ে রয়েছে। তাদের বয়স ৮ থেকে ৬০ বছর।
মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের মানজুং এলাকার একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তার মধ্যে বাসে করে এসব মানুষকে নেওয়া হয়। পরে তাদের লুমুত নৌঘাঁটির কাছের বন্দরে নেওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের দুটি নৌযুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতার আওতায় পর্যায়ক্রমে ৫ হাজার নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপগুলো পরিচয় শনাক্তকরণ, নথিপত্র যাচাই, পরিবহন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর এগোবে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, দুই দেশ ১ হাজার ৪৭৬ জন যাচাইকৃত নাগরিককে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সমন্বয় করেছে। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন যারা মালয়েশিয়ার অভিবাসন আটককেন্দ্রে থাকার পর দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।
মালয়েশিয়া সরকারের বক্তব্য, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তারা দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। সরকার এই কর্মসূচিকে অনিয়মিত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও নিজ দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের অংশ হিসেবে দেখছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটিতে থাকা অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের বক্তব্য, মিয়ানমারে এখনো সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রয়েছে। ফলে সেখানে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
UNHCR জানিয়েছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে ফিরে যাওয়ার উপযোগী নয়। সংস্থাটি আরও বলেছে, প্রত্যাবাসনের জন্য ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় তারা সম্পৃক্ত ছিল না।
এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়া ও Asylum Access Malaysia প্রত্যাবাসন স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কারা শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী এবং তাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে।
প্রত্যাবাসন কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য ফেরত পাঠানো নিয়ে। মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা বা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, সে তথ্য প্রকাশ করেনি।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নাগরিকত্ব ও জাতিগত স্বীকৃতি-সংক্রান্ত সংকটে রয়েছে। ২০১৭ সালে ব্যাপক সহিংসতার পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। মালয়েশিয়াতেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন অভিবাসন আটককেন্দ্রে ১০ হাজার ৩৮৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন। প্রথম দফার প্রত্যাবাসনের পরও বিপুলসংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিক মালয়েশিয়ায় অবস্থান করবেন।
মালয়েশিয়া এর বাইরে দেশটিতে থাকা অনিবন্ধিত অভিবাসী ও শরণার্থীদের জন্য নিজস্ব নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা হবে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত চলছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘ ও অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের মূল কারণও এটি।
মালয়েশিয়া অবশ্য বলছে, দুই দেশের কূটনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে এবং যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপগুলোও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার।
আরও পড়ুন:







