ইরানে ওষুধের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সংকটে রোগী ও তাদের পরিবারগুলো চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে। দেশটির মুদ্রার ব্যাপক দরপতন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি ও পরিবহন সংকট, বীমা কোম্পানির বকেয়া এবং যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞাজনিত সরবরাহ বিঘ্ন—সব মিলিয়ে দেশটির ওষুধ সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) জানিয়েছে, ইরানে কিছু ওষুধের দাম কয়েক মাসের মধ্যে তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দাম দ্বিগুণ, চারগুণ এমনকি ছয়গুণ পর্যন্ত বাড়ার কথা জানিয়েছেন ফার্মেসির কর্মীরা। একই সঙ্গে প্রেসক্রিপশনের সব ওষুধ একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না; একটি ওষুধের জন্য রোগীদের একাধিক ফার্মেসিতে ঘুরতে হচ্ছে।
তেহরানে ১২ বছর বয়সী এক অসুস্থ শিশুর জন্য চার ধরনের ওষুধ কিনতে দুই দিন ধরে বিভিন্ন ফার্মেসিতে ঘুরেছেন এক দম্পতি। প্রতিটি ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশনের এক-দুটি ওষুধ পাওয়া গেলেও সবগুলো একসঙ্গে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত একটি ওষুধ তারা কোথাও খুঁজে পাননি।
ওই পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওষুধ খোঁজার পেছনে দুই দিন সময় চলে যাওয়ায় তাদের আয়েরও ক্ষতি হয়েছে। AP-এর প্রতিবেদনে ঘটনাটি ইরানের সাধারণ রোগীদের সামনে থাকা দ্বিমুখী সংকট—চিকিৎসার ব্যয় এবং আয়ের ক্ষতি—দুটিই তুলে ধরেছে।
ইরানের সরকারি ওষুধ মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থার প্রধান মেহদি পিরসালেহি জানান, গত ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে প্রায় ২ হাজার ধরনের ওষুধের দাম সংশোধন করা হয়েছে।
AP-এর তথ্য অনুযায়ী, কিডনি ডায়ালাইসিস রোগীদের ব্যবহৃত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্যাবলেটের দাম সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় ৩৫০ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণ ব্যথানাশক প্যারাসিটামলের দামও বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেটিও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক তেহরানবাসী জানান, প্রদাহের জন্য নিয়মিত ব্যবহার করা একটি মলমের দাম তিন মাসে ৭ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল থেকে বেড়ে ৩২ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসে দাম চারগুণেরও বেশি হয়েছে।
ইরান নিজ দেশে বিপুল পরিমাণ ওষুধ উৎপাদন করে। তবে উৎপাদন মানেই কাঁচামাল ও প্রযুক্তিতে পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা নয়। দেশটির ওষুধ শিল্পকে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে সক্রিয় উপাদান, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত ওষুধ আমদানি করতে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় আমদানিকারকদের আরও ব্যয়বহুল আকাশপথ ব্যবহার করতে হয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে সেই পথও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাগুলো সরাসরি ওষুধ বিক্রিকে নিষিদ্ধ করে না। তবে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো ইরানের সঙ্গে লেনদেন করতে অনাগ্রহী বা সতর্ক হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে কাগজে-কলমে কোনো ওষুধ বাণিজ্য নিষিদ্ধ না হলেও বাস্তবে অর্থ পরিশোধ ও পণ্য পরিবহন জটিল হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইরানের ওষুধ সংকটের পেছনে অবশ্য শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়—যুদ্ধ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয়, বীমা ব্যবস্থার বকেয়া এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাকেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশটির ফার্মেসিগুলোও আর্থিক চাপে রয়েছে। AP-এর প্রতিবেদনে ইরানের একটি সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটির সদস্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ফার্মেসিগুলোর পাওনা পরিশোধে কয়েক মাস পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। ফার্মেসি মালিকদের সংগঠনের একজন প্রতিনিধির হিসাবে, বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ২৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
বীমা বাবদ অর্থ পেতে দেরি হলে ফার্মেসিগুলোর পক্ষে নতুন করে ওষুধ কেনা ও মজুত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংকটের প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করছে ক্যানসার, কিডনি রোগ, মানসিক রোগ ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য।
AP জানিয়েছে, কিছু হাসপাতালে বিশেষায়িত মানসিক রোগের ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কিছু চিকিৎসককে বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একজন কর্মী জানিয়েছেন।
ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এক রোগীর পরিবারের সদস্য জানান, চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের সরবরাহ আগের তুলনায় অনিয়মিত হওয়ায় চিকিৎসার সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা চলছে। তবে হাসপাতালের বাইরে, বিশেষ করে ফার্মেসি পর্যায়ে সংকট বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এর ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগী হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর প্রেসক্রিপশনের ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে নতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ইরানের ওষুধ সংকট এখন শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি সরবরাহ, আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রা, বীমা পরিশোধ এবং রোগীর ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত একটি বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
সরকার হাসপাতাল ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় ওষুধ সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে মুদ্রার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়, পরিবহন সংকট ও বকেয়া পরিশোধের সমস্যা অব্যাহত থাকলে ফার্মেসি পর্যায়ে সাধারণ রোগীদের জন্য ওষুধের প্রাপ্যতা ও দাম—দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
আরও পড়ুন:







