সাংবাদিকতা থেকে রাজসিংহাসনে—নাটকীয় এই উত্থানের মধ্য দিয়ে উগান্ডার ঐতিহাসিক তোড়ো রাজ্যের নতুন রাজা হয়েছেন এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। ৫৬ বছর বয়সী এই সাবেক টেলিভিশন সাংবাদিক ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এডওয়ার্ড রুকিডি ন্যাবঙ্গো প্রথম’ নামে তোড়ো রাজ্যের রাজা বা ওমুকামা হিসেবে অভিষিক্ত হন।
তোড়ো রাজ্যের রাজধানী ফোর্ট পোর্টালের কারুজিকা প্যালেসে ঐতিহ্যবাহী নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে হাজারো মানুষ অংশ নেন। উগান্ডার সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে উপস্থিত ছিলেন।
রাজা হওয়ার আগে এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা ছিলেন পেশাদার সাংবাদিক ও সম্প্রচারক। তিনি উগান্ডার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম Uganda Broadcasting Corporation (UBC)-এ সংবাদ উপস্থাপক ও সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার সাংবাদিকতা জীবনের মেয়াদ দুই দশকেরও বেশি।
১৯৭০ সালে ফোর্ট পোর্টালের কাছে কিডুকুরু গ্রামে জন্ম নেওয়া কিজানাঙ্গোমা পরে উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী কাম্পালায় যান। তিনি মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে গণযোগাযোগ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উগান্ডা ও প্রতিবেশী রুয়ান্ডায় সম্প্রচার সাংবাদিকতায় কাজ করেন।
তবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন তোড়োর রাজপরিবারের সদস্য। তার বাবা ছিলেন প্রয়াত প্রিন্স ক্রিস্টোফার পল কিজানাঙ্গোমা। কিজানাঙ্গোমা হলেন সাবেক রাজা জর্জ ডেভিড রুকিডি তৃতীয়ের নাতি এবং প্রয়াত রাজা ওয়ো নাইম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি চতুর্থের চাচাতো ভাই।
তোড়ো রাজ্যের আগের রাজা ওয়ো নাইম্বা রুকিডি চতুর্থ ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট ৩৪ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান। মাত্র তিন বছর বয়সে ১৯৯৫ সালে সিংহাসনে বসেছিলেন তিনি এবং দীর্ঘ ৩১ বছর তোড়ো রাজ্যের প্রতীকী নেতৃত্ব দেন।
তার মৃত্যুর পর নতুন রাজা নির্বাচন নিয়ে রাজপরিবারে বিরোধ দেখা দেয়। তোড়োর রাজপরিবারের বেবিটো (Babiito) গোত্রের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের একটি উত্তরাধিকার কমিটি নতুন রাজা নির্বাচনের দায়িত্ব নেয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রিন্স এডওয়ার্ড কিজানাঙ্গোমাকে নির্বাচিত করা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর তোড়ো সুপ্রিম কাউন্সিল বা রুকুরাতো তার নির্বাচন অনুমোদন করে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ওঠে। প্রয়াত রাজা ওয়োর মা কুইন মাদার বেস্ট কেমিগিসা এবং বোন প্রিন্সেস রুথ কোমুনতালে দাবি করেন, ওয়ো একটি পুত্রসন্তান রেখে গেছেন এবং তার উইল অনুযায়ী সেই সন্তানই উত্তরাধিকারী হওয়া উচিত। এ নিয়ে রাজপরিবারে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হয়।
রাজপরিবারের উত্তরাধিকার কমিটি অবশ্য এডওয়ার্ডের নির্বাচন বহাল রাখে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর তার অভিষেক সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই উত্তরাধিকার-বিতর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; একই সঙ্গে বিরোধী পক্ষের দাবির কিছু বিষয় এখনো বিতর্কিত।
এডওয়ার্ড রুকিডির রাজ্যাভিষেকের আগে শুরু হয় দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। রাতের বেলায় তিনি রওনা হন রোয়েঙ্গোমা প্যালেস থেকে। এরপর জনতার সঙ্গে মিছিল করে কারুজিকা প্যালেসে পৌঁছান।
রাজ্যাভিষেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রতীকী যুদ্ধ বা ‘মক ফাইট’। এর মাধ্যমে নতুন রাজাকে রাজ্য রক্ষা এবং নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতীকী পরীক্ষা দেওয়া হয়। এরপর রাজকীয় আচার, পবিত্র খাবার গ্রহণ এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
ভোরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তার নতুন রাজকীয় নাম ঘোষণা করা হয়—এডওয়ার্ড রুকিডি ন্যাবঙ্গো প্রথম। রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী ঢোল ‘এমপাঙ্গো’ বাজানোর মধ্য দিয়ে তার সিংহাসনে আরোহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
উগান্ডা একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। দেশটির ঐতিহ্যবাহী রাজারা রাষ্ট্রীয় অর্থে সার্বভৌম শাসক নন এবং তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই।
উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী রাজ্যগুলো ১৯৬০-এর দশকে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৩ সালে সরকার এগুলো পুনরায় স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এসব রাজপরিবার মূলত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঐতিহ্যবাহী রাজাদের দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে।
সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করা এডওয়ার্ড রুকিডি এখন এমন এক রাজ্যের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যেখানে ঐতিহ্যের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ।
তোড়ো রাজ্যের নতুন নেতৃত্বের সামনে যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা, কৃষির আধুনিকায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। উগান্ডা সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে রিভার এমপাঙ্গার পরিবেশগত অবস্থা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:







