ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাবে দ্রুত গলছে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ। চলতি ২০২৬ সালে দেশটির হিমবাহগুলোর বরফের পরিমাণ ৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে। গত পাঁচ বছরে মোট বরফের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে বরফ গলতে থাকলে শুধু পাহাড়ি পরিবেশ নয়, পানির সরবরাহ, কৃষি ও জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
সুইস গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক (GLAMOS) ও Swiss Academy of Sciences-এর সর্বশেষ পরিমাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি বরফ হারানোর বছরগুলোর একটি। রেকর্ড গলনের বছর ২০২২-এর পর এটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বার্ষিক ক্ষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর হিমবাহ গলার পেছনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে কাজ করেছে—শীতকালে অস্বাভাবিক কম তুষারপাত এবং মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের তাপপ্রবাহ।
২০২৫-২৬ সালের শীতকাল সুইজারল্যান্ডের পরিমাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম তুষারপাত হওয়া শীতগুলোর মধ্যে ছিল। ফলে হিমবাহের ওপর যে পুরু তুষারের স্তর সাধারণত বরফকে সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষা দেয়, সেটি অনেক আগেই গলে যায়।
এরপর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একাধিক তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। এ সময়ে ৭৬ দিন পাহাড়ি এলাকায় হিমাঙ্কের উচ্চতা ৪ হাজার মিটারের ওপরে ছিল, যা স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং সুইজারল্যান্ডের জন্য রেকর্ড। সেপ্টেম্বর নাগাদ ৩ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতাতেও অনেক জায়গায় শীতের জমে থাকা তুষার আর অবশিষ্ট ছিল না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে সুইজারল্যান্ডের পৃথক হিমবাহগুলোর গড় পুরুত্ব ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত কমেছে। কোনো কোনো হিমবাহের সামনের অংশ বা ‘গ্লেসিয়ার টাং’ গ্রীষ্মকালেই প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত পাতলা হয়ে গেছে।
আলেটশ, রোন ও ক্লারিডেনসহ কয়েকটি হিমবাহে ২০২৬ সালে সর্বকালের সর্বোচ্চ গলন রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে দেশটির কয়েকটি ছোট হিমবাহ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ভালাইস ক্যান্টনের বেলা টোলা এবং গ্লারুস ক্যান্টনের গ্রিসফির্ন হিমবাহও রয়েছে।
হিমবাহ গলার সামগ্রিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২২ থেকে ২০২৬—মাত্র পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ডের মোট হিমবাহের বরফের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। গবেষকদের মতে, এত দ্রুত বরফের মজুত কমে যাওয়া ভবিষ্যতে আল্পস অঞ্চলের পানির প্রাকৃতিক মজুতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে হিমবাহ গলে যে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসছে, তা সাময়িকভাবে গ্রীষ্মকালীন পানির ঘাটতি কমাতে সহায়তা করছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ বিলিয়ন লিটার পানি বের হয়েছে, যা দেশটির সব পরিবারের এক বছরের পানীয়জলের ব্যবহারের চার গুণেরও বেশি। তবে বরফের মজুত ক্রমাগত কমতে থাকায় ভবিষ্যতে এই পানির উৎসও সংকুচিত হবে।
হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রভাব শুধু পানির সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। সুইস সরকারের জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ সঙ্কুচিত হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলছে। এতে পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা কমে ভূমিধস, পাথরধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ বা ডেব্রিস ফ্লোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সুইজারল্যান্ডের সরকারি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক তথ্যেও বলা হয়েছে, দেশটি বন্যা, ভূমিধস, পাথরধস, তুষারধস ও ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে এবং কিছু এলাকায় নতুন ধরনের বিপদও দেখা দিতে পারে।
হিমবাহের বরফ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে সুইজারল্যান্ডের পানি সরবরাহ, কৃষি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে অতিরিক্ত গলন সাময়িকভাবে নদী ও জলাধারে পানির প্রবাহ বাড়ালেও এটি আসলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত বরফের মজুত দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:







