ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা এবং শিক্ষাখাতে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন বিভিন্ন শহরের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার জরুরি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছে ফরাসি সরকার।
গত প্রায় ১০ দিন ধরে চলা এই আন্দোলন শুরুতে প্যারিস অঞ্চলকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ অক্টোবরের আন্দোলনে ফ্রান্সজুড়ে ১ হাজারের বেশি স্কুলে অবরোধ বা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। একই সঙ্গে প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে যোগ দেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের চাপ কমানো, স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষাখাতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়া Parcoursup নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক বিনিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে। আন্দোলনের পরবর্তী বড় কর্মসূচি হিসেবে ৬ অক্টোবর জাতীয় পর্যায়ে আরও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের সঙ্গে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। মার্সেই, নঁত, রুয়াঁ, স্ট্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন এলাকায় আবর্জনার স্তূপে আগুন, সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। নঁতের একটি স্কুলের প্রবেশ হলও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১ অক্টোবর প্রায় ১,৯৪৯ জনকে আটক করা হয়। একই দিনে পুলিশ, জেন্ডারমেরি ও দমকল বাহিনীর ৩০৫ সদস্য আহত হয়েছেন বলে সরকার জানিয়েছে। তবে আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এবং তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বৃহস্পতিবার একটি সংকট বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকের পর সরকার নিরাপত্তা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। যেসব স্কুলে অবরোধ বা ক্ষয়ক্ষতির কারণে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে অনলাইন ক্লাস চালুর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। প্রায় ৪০০টি স্কুল শুক্রবার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শুক্রবার শিক্ষার্থী সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন এবং অভিভাবকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবিগুলো শোনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বিক্ষোভের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়েও ফ্রান্সে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার বামপন্থী দল La France Insoumise (LFI) এবং উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে LFI এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে।
সরকার একদিকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন:







