ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রভাবে খাদ্যসংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির যেসব এলাকায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) কাজ করতে পারছে, সেসব এলাকায় প্রায় প্রতি চারটি পরিবারের তিনটি পরিবারই তাদের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। WFP জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে এটি খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির সর্বোচ্চ অবনতির চিত্র।
WFP-এর ২ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার-নিয়ন্ত্রিত ও সংস্থাটির কাছে প্রবেশযোগ্য এলাকাগুলোতে ৭৪ শতাংশ পরিবার পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারছে না। এসব এলাকায় আনুমানিক ১ কোটি মানুষ বসবাস করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর খাদ্য সরবরাহ, বাজারব্যবস্থা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ১ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্য উদ্ধৃত করেছে WFP। অনেক পরিবার এর আগেও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
WFP জানিয়েছে, আদেনের আশপাশের লাহজ এবং তাইজ এলাকায় নতুন করে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো খাবার ও পানির সংকটে পড়ছে। অনেক পরিবার দিনের পর দিন হেঁটে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছাচ্ছে এবং তাদের কারও কারও কাছে পর্যাপ্ত খাবার বা পানি নেই।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু পরিবারকে সংঘাতের কারণে দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থবারের মতো ঘর ছাড়তে হয়েছে। তাদের কেউ কেউ সঙ্গে নিয়ে আসা রুটি এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি সাধারণ খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
WFP-এর হিসাবে, পুরো ইয়েমেনে বর্তমানে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। প্রায় ৫ লাখ শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত, যা শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী অপুষ্টির পর্যায়গুলোর একটি।
জাতিসংঘের মার্চ ২০২৬-এর মানবিক পরিস্থিতি পরিকল্পনাতেও ইয়েমেনের খাদ্যসংকটকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালে দেশটির ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন হবে।
সংঘাতের পাশাপাশি খাদ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইয়েমেন তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। ফলে যুদ্ধের কারণে বন্দর, সড়ক, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে দ্রুত খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ে।
WFP জানিয়েছে, কিছু এলাকায় মাত্র দুই সপ্তাহে গমের আটার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভোজ্যতেলের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে কিংবা তুলনামূলক কম পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে।
সংঘাতের কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার কমে গেছে। WFP বলছে, তাইজ ও হোদেইদাহর কিছু অংশে তারা এখন আর নিয়মিতভাবে পৌঁছাতে পারছে না। এর ফলে আগে সহায়তা পাওয়া প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এর মধ্যেই নতুন বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা বাড়াচ্ছে WFP। সংস্থাটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাইজ ও লাহজ এলাকায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে WFP জরুরি ভিত্তিতে ১০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার চেয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত সর্বোচ্চ ১৫ লাখ মানুষকে খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, নতুন অর্থ না এলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খাদ্য মজুত ও অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে WFP-এর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষও সমস্যায় পড়তে পারেন।
ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটির সংঘাত শুধু স্থানীয় খাদ্যসংকটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে সতর্ক করেছে WFP। ইয়েমেনের কাছে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যার প্রভাব ইয়েমেনের বাইরেও খাদ্য ও জ্বালানি বাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
WFP-এর কর্মকর্তা ম্যাথিউ হলিংওয়ার্থ জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ে সতর্ক করেছেন, ইয়েমেনে শুরু হওয়া খাদ্যসংকট আরও বড় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সংকটকে তীব্র করতে পারে।
জাতিসংঘ বলছে, সংঘাত বন্ধ, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতেই জাতিসংঘের মানবিক পরিকল্পনায় দেশটির লাখ লাখ মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:







