যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে কানাডা সম্ভাব্য সামরিক ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি জানিয়েছেন, কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। তবে তিনি এটিকে সম্ভাব্য বা আসন্ন যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে উল্লেখ করেননি; বরং অত্যন্ত চরম ঝুঁকির পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তুতি নেওয়াকে দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি বলেন, সরকারের দায়িত্বের অংশ হিসেবে ‘extreme tail risk’ বা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও চরম ঝুঁকির পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি সরকারের মূল বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি নয়; তবে এমন সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি না নেওয়াও দায়িত্বশীল হবে না।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক মন্তব্যও অটোয়ার উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা নাকচ করেছিলেন।
অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা কাঠামোতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিশেষ করে NORAD দুই দেশের যৌথ মহাকাশ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায় না।
কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালে আর্কটিক ও উত্তরাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, এসব অভিযানের লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা, প্রতিরোধ করা এবং প্রয়োজন হলে কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। স্থল, সমুদ্র, আকাশ, সাইবার ও মহাকাশ—সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
আগস্টে কানাডা Operation NANOOK-TUUGAALIK শুরু করে। এর আওতায় আর্কটিক অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি, নজরদারি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্গম উত্তরাঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযানে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ডেনমার্কের নৌবাহিনীর সদস্যরাও অংশ নিয়েছে।
অর্থাৎ, কানাডার সামরিক প্রস্তুতি কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নয়। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা, চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং উত্তরাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বও কানাডা ও ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখছে। ন্যাটোও ২০২৬ সালে আর্কটিক অঞ্চলে Arctic Sentry নামে সামরিক কার্যক্রম জোরদার করেছে।
বর্তমান তথ্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। বরং কানাডার সরকারের বক্তব্য হলো—অত্যন্ত অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে কার্নির বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন একটি সম্ভাবনাকে কানাডার সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঝুঁকি-পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—যা সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাত্রা বোঝায়। একই সময়ে আর্কটিকে কানাডার সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে এবং ন্যাটোও উত্তরাঞ্চলে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করছে।
আরও পড়ুন:







