দেখতে অনেকটা ছোট আকারের চিতাবাঘের মতো, ওজন গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও কম। দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ার ঘন মেঘবন থেকে এমনই এক ক্ষুদ্র বন্য বিড়ালকে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। Leopardus tilcayo নামের এই প্রাণীটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর বিজ্ঞানীদের আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা প্রথম নতুন জীবিত বন্য বিড়াল প্রজাতি।
নতুন প্রজাতিটির বসবাস বলিভিয়ার ইউঙ্গাস (Yungas) মেঘবনে, যেখানে আন্দিজ পর্বতমালার পূর্ব ঢাল অ্যামাজন অববাহিকার সঙ্গে মিলেছে। প্রাণীটির শরীর সরু, গায়ে বাদামি রঙের ওপর বড় বড় কালচে ছোপ এবং লেজে বলয়াকৃতির দাগ রয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এর আকার—একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দৈর্ঘ্য মাথা থেকে শরীরের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন মাত্র ৩ পাউন্ড বা প্রায় ১ দশমিক ৪ কেজি।
বিজ্ঞানীদের কাছে প্রাণীটি নতুন হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে এটি একেবারে অজানা ছিল না। গবেষকরা জানিয়েছেন, বলিভিয়ার ইউঙ্গাস অঞ্চলের স্থানীয় সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই এই বিড়ালকে ‘টিলকায়ো’ নামে চিনত। নতুন বৈজ্ঞানিক নাম Leopardus tilcayo সেই স্থানীয় নাম থেকেই নেওয়া হয়েছে।
প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় সামনে আসে মূলত একটি বিশেষ বিড়ালের মাধ্যমে। ২০১৬ সালের দিকে একটি স্থানীয় পরিবার বনের মধ্যে একটি শাবক খুঁজে পায় এবং সেটিকে গৃহপালিত বিড়াল ভেবে বাড়িতে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রাণীটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বন্য স্বভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে ২০১৭ সালে তাকে বলিভিয়ার Senda Verde Wildlife Sanctuary-তে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাণীটির অস্বাভাবিক ছোট আকার ও চেহারা গবেষকদের নজরে আসে।
বলিভিয়ার জীববিজ্ঞানী ও গবেষক Paola Nogales-Ascarrunz প্রাণীটির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে প্রজাতি নির্ধারণ না করে গবেষকরা জিনগত বিশ্লেষণের আশ্রয় নেন।
দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ৩০টির বেশি বন্য বিড়ালের জিনোমের সঙ্গে এই প্রাণীর জিনগত তথ্য তুলনা করা হয়। পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাদুঘরে সংরক্ষিত পুরোনো হাড় ও চামড়ার নমুনা থেকেও ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। এই সম্মিলিত জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাণীটি আগে পরিচিত কোনো প্রজাতির অংশ নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র বিবর্তনীয় বংশধারার প্রতিনিধি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, Leopardus tilcayo-র পূর্বপুরুষেরা তাদের নিকটাত্মীয়দের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রাণীটির বিবর্তনীয় ইতিহাস অত্যন্ত পুরোনো হলেও এতদিন এটি আলাদা প্রজাতি হিসেবে বিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক তালিকায় ছিল না।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বিজ্ঞানীরা এর আগে সর্বশেষ নতুন জীবিত বন্য বিড়াল প্রজাতি হিসেবে Uruguayan pampas cat (Leopardus fasciatus)-কে ১৯২৩ সালে বর্ণনা করেছিলেন। এরপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আবার একটি নতুন জীবিত বিড়াল প্রজাতির আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দেওয়া হলো।
গবেষণাটি শুধু নতুন একটি প্রজাতির পরিচয়ই সামনে আনেনি। দক্ষিণ আমেরিকার তথাকথিত ‘টাইগার ক্যাট’ বা ছোট ছোপযুক্ত বন্য বিড়ালদের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও নতুন তথ্য দিয়েছে।
আগে এসব দেখতে কাছাকাছি বিড়ালকে অনেক ক্ষেত্রে একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত মনে করা হতো। নতুন জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই গোষ্ঠীতে অন্তত পাঁচটি স্বতন্ত্র প্রজাতি রয়েছে।
নতুন প্রজাতি শনাক্ত হলেও বিজ্ঞানীদের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন—প্রকৃতিতে এই প্রাণীর সংখ্যা কত?
এখন পর্যন্ত বলিভিয়ার ইউঙ্গাস অঞ্চলে এর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এর বিস্তৃত আবাসভূমি কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এবং বনে মোট কতগুলো টিলকায়ো বিড়াল রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। গবেষকরা প্রাণীটির খাদ্যাভ্যাস, আচরণ, প্রজনন এবং প্রকৃত বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে গবেষকদের হাতে থাকা পরিচিত নমুনাগুলোর মধ্যে Senda Verde sanctuary-তে থাকা পুরুষ বিড়ালটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটিকেই নতুন প্রজাতির বৈজ্ঞানিক বর্ণনায় প্রতিনিধিত্বকারী নমুনা বা holotype হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিলকায়ো যে ইউঙ্গাস মেঘবনে বাস করে, সেই আবাসভূমি বন উজাড় এবং সোনার খনির মতো মানবীয় কর্মকাণ্ডের চাপে রয়েছে। ফলে প্রজাতিটির প্রকৃত সংখ্যা ও বিস্তৃতি জানার আগেই এর আবাসস্থল সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







