জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে ভাঙারি কুড়িয়ে। অর্থকষ্ট, ঋণ আর স্বজনদের কাছ থেকে দূরে সরে একসময় আশ্রয় হয়েছিল পরিত্যক্ত ভবনে। অথচ সেই বৃদ্ধের ব্যাংক হিসাবেই জমা ছিল লাখ লাখ টাকা। চীনের হুনান প্রদেশের ৭১ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের জীবনে এমনই চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে।
চীনা সংবাদমাধ্যম সাংদে ডেইলি-র বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই বৃদ্ধের নাম রু। তাঁর ব্যাংক হিসাবে পাওয়া গেছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ২০৪ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।
রুর বাড়ি চীনের হুনান প্রদেশের জুঝো শহরে। কারিগরি স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে তিনি একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দোকানে চাকরি নেন। সেখানে প্রায় ৩০ বছর কাজ করার পর ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে চাকরি হারান তিনি।
চাকরি হারানোর সময় কিছু ক্ষতিপূরণের অর্থ পেলেও তা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি রু। একপর্যায়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়।
জীবিকার তাগিদে শেষ পর্যন্ত নিজের শহর ছেড়ে হুনান প্রদেশের সাংদে শহরে চলে যান তিনি। সেখানে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন—রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভাঙারি সংগ্রহ করে তা বিক্রি করেই চলতে থাকেন দিন। প্রায় ২১ বছর ধরে এভাবেই জীবন কাটান তিনি।
রুর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। সাংদে শহরে ভাঙারি সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ সময় একটি পরিত্যক্ত ভবনে অবস্থান করতেন।
২০২৪ সালে সাংদে শহরের একটি সামাজিক সহায়তা কেন্দ্রের কর্মকর্তা ওই পরিত্যক্ত ভবনে রুর সন্ধান পান। তাঁকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আত্মসম্মানবোধের কারণে শুরুতে তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।
পরে অবশ্য তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হন এবং সেখানে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য জানান। সেই তথ্যের সূত্র ধরেই তাঁর পুরোনো চাকরি ও পেনশন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সামনে আসে।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় সম্প্রতি। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রু তাঁর পেনশন হিসাবের সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যাংক কার্ড হাতে পান।
কার্ড পাওয়ার পর ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের পরিমাণ দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান। হিসাবে জমা ছিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ২০৪ ইউয়ান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অর্থের বড় অংশ যে তাঁর পেনশন হিসেবে জমা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে রুর কোনো ধারণাই ছিল না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে রু পেনশন পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না যে তাঁর নামে নিয়মিত অর্থ জমা হচ্ছে।
চাকরি হারানোর পর রু পেনশন বিমার কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে তিনি ধারণা করেছিলেন, পেনশন পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। সেই ধারণা থেকেই পেনশন-সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আর খোঁজ নেননি তিনি।
এ ছাড়া রুর কোনো মোবাইল ফোনও ছিল না। ফলে পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তন, সরকারি তথ্য বা তাঁর হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার বিষয়ে কোনো বার্তাও তাঁর কাছে পৌঁছায়নি।
রুর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চীনা সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে মূলত তাঁর জীবনযাত্রা ও ব্যাংক হিসাবের মধ্যে বিশাল পার্থক্যের কারণে।
একদিকে দিনের পর দিন ভাঙারি কুড়িয়ে জীবন কাটিয়েছেন তিনি, অন্যদিকে নিজের অজান্তেই তাঁর পেনশন হিসাবে জমা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, রু দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করছিলেন। নিজের ব্যাংক হিসাবে এত অর্থ রয়েছে—এমন ধারণাও তাঁর ছিল না।
শেষ বয়সে এসে ব্যাংকে এত বড় অঙ্কের অর্থের সন্ধান পাওয়া রুর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের কষ্টের পর এখন তাঁর নিজের নামে সঞ্চিত পেনশন অর্থ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই ঘটনা একই সঙ্গে বয়স্ক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সরকারি পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আর্থিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বও সামনে এনেছে।
আরও পড়ুন:







