News Ticker
221.png

বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকারে বিপর্যস্ত ইয়েমেন, চরম দুর্ভোগে জনজীবন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫২

শেয়ার

শেয়ার

বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকারে বিপর্যস্ত ইয়েমেন, চরম দুর্ভোগে জনজীবন
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকার ও অসহনীয় গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের জনজীবন। বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী আদেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা, পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখন শহরটির মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। 

আদেনে বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু ঘরবাড়িই অন্ধকার হয়ে যায় না, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনও প্রায় থমকে যায়। ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ঘরে থাকতে পারছে না। কেউ কেউ রাতের বেলায় উপকূলের দিকে ছুটছেন অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাসের আশায়। শিশুদেরও দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে কাটাতে হচ্ছে। 

আদেনের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয় পর্যবেক্ষণভিত্তিক একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় খুবই সীমিত ছিল। শেখ উসমান এলাকায় দৈনিক গড়ে প্রায় ১৭ ঘণ্টা এবং আল-মানসুরায় প্রায় ১৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু এলাকায় সরবরাহ ছিল আরও কম। 

ফলে বিদ্যুৎ কখন আসবে, আর কতক্ষণ থাকবে—এ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিদ্যুৎ এলে মানুষ দ্রুত মোবাইল ফোন, ব্যাটারি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র চার্জ করে নেয়। অনেক পরিবারের কাছে ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা ব্যাটারি থাকলেও তা দিয়ে কেবল আলো, ফ্যান কিংবা ফোন চার্জের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে।

আদেনে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্যান ও এসি বন্ধ হয়ে যায়। রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে ঘরের বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় সন্ধ্যার পর মানুষের ভিড় বাড়ছে; কেউ সমুদ্রের পানিতে নামছেন, আবার কেউ তীরের পাশে বসে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

শিশুদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। ঘরের ভেতর প্রচণ্ড গরম থাকায় অনেক শিশু রাস্তায় বেরিয়ে খেলাধুলা করছে। বিদ্যুৎনির্ভর স্বাভাবিক জীবন তাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত হয়ে উঠেছে। 

বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে। অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, পরীক্ষাগার, ওষুধ ও টিকার সংরক্ষণ, নবজাতকের ইনকিউবেটর এবং ডায়ালাইসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।

বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালগুলোকে জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিড—এই একাধিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা চিকিৎসকদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ইয়েমেনে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করছে। ২০২৫ সালে সংস্থাটি দেশটির ১৭৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জেনারেটর ও জরুরি সরঞ্জাম সচল রাখতে প্রায় ৪৩ লাখ ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি সরবরাহ করেছিল।

কিডনি রোগীদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ডায়ালাইসিস মেশিন চালু রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চিকিৎসা সময়মতো সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে বাড়িতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের রিচার্জেবল বাতি বা ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) জানিয়েছে, আদেনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমস্যায় পড়েছেন। কয়েকটি স্কুলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। 

ইয়েমেনে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কারণে সৌরবিদ্যুৎ ক্রমেই বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অর্ধেকের বেশি পরিবার কোনো না কোনোভাবে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। বাড়ি, স্কুল, দোকান ও হাসপাতালের ছাদে সৌর প্যানেল এখন দেশটির পরিচিত দৃশ্য।

তবে সৌরবিদ্যুৎ সবার নাগালের মধ্যে নেই। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলো বড় প্যানেল ও ব্যাটারি কিনে বেশি সময় বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে পারলেও দরিদ্র পরিবারগুলো অনেক সময় শুধু একটি বাতি, ফ্যান বা মোবাইল ফোন চার্জ করার মতো সীমিত সুবিধা পায়। ফলে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সামাজিক বৈষম্যকেও আরও স্পষ্ট করে তুলছে। 

ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ অবকাঠামোর দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতও বেড়েছে, যার ফলে মানবিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। 

ChannelNRB Footer